মৌবাজের ছানা
৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:১২ PM

মধু ও মৌমাছিভুক পাখিটিকে প্রথম দেখি রাজশাহী থেকে ট্রেনযোগে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে পাকশীর হার্ডিঞ্জ সেতুতে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে। তবে ট্রেনের দ্রুতগতির কারণে সঙ্গে ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও ছবি তুলতে পারিনি। ঠিক এক মাস পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে পাখিটির ছবি তুলতে সক্ষম হলাম। এরপর বিভিন্ন সময়ে দেখেছি ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় যাওয়ার পথে কুতুবজোম এলাকায় এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পাখিটিকে দেখলাম মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানার কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রমে।
পরের বছর উড়োজাহাজের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষের ওপর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে একটি প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পাই। এর উদ্দেশ্য ছিল হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতর ও বাইরে অবস্থানরত পাখিদের একটি তালিকা তৈরি করা। এ কারণে প্রায় দেড় বছর বিমানবন্দর ও তার ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে অবস্থানকারী পাখিদের নিয়ে জরিপের কাজ করেছিলাম।
২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল সকালে বিমানবন্দরের ভেতরে পাখি জরিপ করতে গিয়ে বিমানবন্দর ও কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটির সীমানাপ্রাচীরের পাশে একটি বড় মেঘশিরীষগাছে মধুভুক সেই পাখিগুলোর দুটিকে বসে থাকতে দেখলাম। প্রায় ৩২টি ছবি তোলার পর পাখিগুলো ওখান থেকে উড়ে গিয়ে সীমানাপ্রাচীরের ল্যাম্পপোস্টে বসল। ওখানে ওদের ৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড অবস্থানকালে আরও ৫২টি ছবি তুললাম।
পাখিগুলোর চেহারা দেখেই বোঝা গেল এগুলো অল্পবয়স্ক অর্থাৎ ছানা পাখি। প্রায় সাড়ে আট মাস পর একই প্রজাতির আরেকটি পাখিকে রানওয়ের ওপর উড়তে দেখলাম। একটি ভুবন চিলের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল। হতে পারে এটি সেই ছানাগুলোরই একটি। তখন বুঝতে পারিনি যে এটি সাড়ে আট মাস আগে দেখা সেই প্রজাতির শিকারি পাখি। বাসায় এসে কম্পিউটারে ছবি আপলোড করার পরই পাখিটিকে চিনতে পারলাম।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেখা এই শিকারি পাখিগুলো এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি মৌবাজ। মধুবাজ বা মৌচিল নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে বলে মৌখাকি বাজ। ইংরেজি নাম ওরিয়েন্টাল/ক্রেস্টেড/ইস্টার্ন হানি-বাজার্ড। অ্যাক্সিপিট্রিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম pernis ptilorhynchus। বাংলাদেশ ছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মেলে।
প্রথম দর্শনে বাজের মতো দেখালেও প্রকৃতপক্ষে মৌবাজ লম্বা ও সরু দেহের এক প্রজাতির চিল। তবে চিলের তুলনায় মাথা অপেক্ষাকৃত ছোট। লম্বায় ৫৫-৬৮ সেন্টিমিটার। পুরুষ পাখির ওজন ৭৫০ থেকে ১ হাজার ২৮০ গ্রাম। স্ত্রী পাখির ওজন বেশি—৯৫০ থেকে ১ হাজার ৪৯০ গ্রাম। দেহের রঙে বেশ বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। যদিও প্রথম দর্শনে মাথায় কালচে ছোট ঝুঁটিযুক্ত কালচে-লালচে-বাদামির মিশেলে গড়া চিত্র-বিচিত্র এক পাখি বলে মনে হবে। কিন্তু সাধারণভাবে সে ধূসর মাথাওয়ালা এক চিল, যার বুক-পেট বাদামি। এর ওপর আড়াআড়িভাবে থাকে অসংখ্য সাদাটে-বাদামি রেখা। গলা সাদাটে। চোখ কমলা-লাল। ঠোঁট মেটে-কালো। পা ও পায়ের পাতা হলুদ। স্ত্রীর মুখমণ্ডল ও পিঠ তুলনামূলকভাবে বাদামি। পুরুষের লেজে দুটি ও স্ত্রীর লেজে তিনটি কালো ফিতের মতো রয়েছে।
মৌবাজ দেশের যেকোনো অঞ্চলে দেখা যেতে পারে। ওরা বনের মধ্যে ফাঁকা জায়গা, আবাদি জমি বা ছায়াঘেরা বন-বাগানে বাস করে। মৌচাকের মধু, মৌমাছির ডিম ও বাচ্চা এদের অত্যন্ত প্রিয়। এ ছাড়া সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, গিরগিটি ইত্যাদি খায়। এপ্রিল থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে ৬-২৮ মিটার উচ্চতায় গাছের শাখায় সরু ডালপালা ও পাতা দিয়ে বাসা গড়ে। বাসা বানানো হয়ে গেলে স্ত্রী তাতে ১-৩টি ফিকে লালচে রঙের ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ২৮-৩৫ দিনে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ে মিলে ছানাদের খাওয়ায় ও লালন–পালন করে। পাঁচ-ছয় সপ্তাহে ছানারা উড়তে শেখে। কিন্তু মা–বাবার সাহায্য ছাড়া স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে আরও পাঁচ থেকে আট সপ্তাহের প্রয়োজন হয়। আয়ুষ্কাল ১১-১২ বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব নিয়ে গুরু–শিষ্যের দ্বন্দ্ব
৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:৫২ AM · প্রথম আলো
ঢাকায় মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাতকড়া পরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পুনর্বাসন কেন্দ্রের দুই কর্মী আটক
৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১০:৫৭ AM · প্রথম আলো
জন্মের তিন দিনের মাথায় মা, এবার ডেঙ্গুতে বাবাকে হারাল ৯ বছরের আরফা
৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:৪৩ PM · প্রথম আলো
নাট্যমঞ্চ থেকে হয়েছিল সিনেমা হল, আগুনে পুড়ল ময়মনসিংহের ‘ঝলমল’
৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:৩৯ PM · প্রথম আলো
