শাহজাদপুর সংবাদ

মাধ্যমিক শিক্ষার কারিকুলাম যেমন চাই

২৪ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:৩৬ AM

মাধ্যমিক শিক্ষার কারিকুলাম যেমন চাই

একটি আধুনিক, স্বনির্ভর ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। আর পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিস্তম্ভ হলো মাধ্যমিক শিক্ষা। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাস্তবতাবিবর্জিত কারিকুলাম চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এখনই উপযুক্ত সময়। সরকারের শিক্ষাবিষয়ক নির্বাচনী ইশতেহার মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দূরদর্শী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রথম ধাপই হওয়া উচিত মাধ্যমিক শিক্ষার কারিকুলামের বাস্তবভিত্তিক সংস্কার। প্রয়োজন এমন একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাক্রম, যা একদিকে বিশ্বমানের দক্ষ নাগরিক তৈরি করবে, অন্যদিকে জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা

অতীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৌশলগত ত্রুটি, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সমন্বয়হীনতা ছিল স্পষ্ট। সম্প্রতি কিছু ক্ষেত্রে পরিমার্জন করা হলেও মূল্যায়ন পদ্ধতি অনেকের কাছে জটিল ও অস্পষ্ট। বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয় এবং কোচিং ও গাইড বই নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

বিজ্ঞান ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে উচ্চশিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মমুখী দক্ষতা ও জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষার ঘাটতি থাকলে শিক্ষাব্যবস্থা সনদ নির্ভর হয়ে পড়তে পারে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ ও সহ-পাঠক্রমিক কাজের মতো মৌলিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মাধ্যমিক শিক্ষার পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা

মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কারের রূপরেখা কতটা বাস্তবসম্মত হওয়া প্রয়োজন, তা বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কার্যক্রমকে আরও দক্ষতার সঙ্গে তদারকি ও সমন্বয় করতে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন।

বর্তমানে মাধ্যমিক শিক্ষা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা গেলে পরিকল্পনা, তদারকি, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও কারিকুলাম বাস্তবায়নে আরও কার্যকর সমন্বয় সম্ভব হবে। তাই আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে একটি যুগোপযোগী প্রশাসনিক কাঠামো ও আধুনিক কারিকুলামের আওতায় আনতে না পারলে দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।

উন্নত বিশ্বের সফল মডেল ও আমাদের করণীয়

বিশ্বায়নের এই যুগে বিভিন্ন দেশের সফল ও সময় পরীক্ষিত শিক্ষাপদ্ধতি পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুযায়ী কারিকুলাম সাজানো উচিত। জাপানে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও নাগরিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফিনল্যান্ডে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি আন্তবিষয়ক ও বাস্তব সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব রয়েছে। সিঙ্গাপুরের ‘টিচ লেস, লার্ন মোর’ ধারণায় কম বিষয়বস্তু মুখস্থ করানোর পরিবর্তে গভীরভাবে শেখা, প্রয়োগ ও চিন্তাশক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ায় প্রযুক্তি, দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয় করা হয়েছে। উপরিউক্ত বিভিন্ন দেশের ইতিবাচক বিষয়গুলো আমাদের কারিকুলামে বিবেচনা করা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের নবম-দশম শ্রেণিতে একটি নমনীয় বিষয়-পছন্দ বা ক্রেডিটভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা বাধ্যতামূলক মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি নিজেদের মেধা, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার লক্ষ্য অনুযায়ী আইটি, বিজ্ঞান, ব্যবসা, মানবিক বা কারিগরি বিষয়ের মধ্যে নির্বাচনের সুযোগ পাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের কারিকুলামে মাধ্যমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের ‘এআই লিটারেসি’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা, ডেটা বিশ্লেষণ, কোডিং ও সাইবার নিরাপত্তার মৌলিক জ্ঞান দেওয়া জরুরি।

শিক্ষার্থীদের শুধু এআই ব্যবহারের নিয়ম শেখালেই হবে না; কীভাবে এআইকে দায়িত্বশীলভাবে সমস্যা সমাধান, তথ্য বিশ্লেষণ ও গবেষণার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেই দক্ষতাও গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তথ্যের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, কপিরাইট ও প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে।

বৈশ্বিক নাগরিকত্ব ও আন্তর্জাতিক ভাষাদক্ষতা

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আন্তর্জাতিক ভাষাদক্ষতা। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ভাষাশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সিইএফআরের মতো কাঠামোকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র বিবেচনায় জাপানিজ, জার্মান, আরবি, স্প্যানিশ বা অন্য বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ রাখা যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।

অনুত্তীর্ণদের বিকল্প পথ ও সামাজিক সুরক্ষা

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোনো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না করলে তার সামনে বিকল্প শিক্ষাপথ অনেকটা রুদ্ধ। নতুন কারিকুলামে মূল্যায়নকে আরও নমনীয় ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করা যেতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট বিষয়ে দুর্বল বা ফেল করলে তাকে পুনর্মূল্যায়ন, ক্রেডিট পুনরুদ্ধার বা বিকল্প কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপথে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে নদীভাঙন, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা, উপবৃত্তি ও প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত ল্যাব ও ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ বিদ্যালয়ের ওপর ব্যয়বহুল প্রকল্পের বোঝা না চাপিয়ে স্থানীয় সম্পদ ও চাহিদার আলোকে ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষকদের মানমর্যাদা, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কমিশন

শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। বিশ্বমানের কারিকুলাম তৈরি করলেও তা শ্রেণিকক্ষে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন যোগ্য, প্রশিক্ষিত ও উদ্বুদ্ধ শিক্ষক। তাই শিক্ষকদের জীবনমান, সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, পদোন্নতি, বদলি, প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির জন্য স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নীতি প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য একটি স্বাধীন বা স্বতন্ত্র ‘শিক্ষা কমিশন’ গঠন করে মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, বদলি এবং পেশাগত উন্নয়নের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের নিবিড় ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। উপযুক্ত সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা ও সম্মানজনক বেতনকাঠামো নিশ্চিত না করে কেবল কারিকুলাম পরিবর্তন করে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর সম্ভব নয়।

শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ

ইউনেসকোর এডুকেশন ২০৩০ কাঠামোয় শিক্ষায় জিডিপির ৪-৬ শতাংশ অথবা সরকারি ব্যয়ের ১৫-২০ শতাংশকে একটি বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশকেও ধাপে ধাপে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এই আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষা নিয়ে যেকোনো সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি আধুনিক, টেকসই, বিজ্ঞানমনস্ক ও উৎপাদনমুখী জাতীয় শিক্ষানীতি ও কারিকুলাম প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, এমন একটি মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে মৌলিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও গণিতের শক্ত ভিত্তির পাশাপাশি প্রযুক্তি, ভাষা, কারিগরি দক্ষতা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা গড়ে উঠবে।

কারিকুলাম পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতারও সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে পৃথক মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা, শিক্ষকদের জীবনমান ও পদমর্যাদা উন্নয়ন এবং একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ শিক্ষক পেশাগত কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশ তার বিপুল মানবসম্পদকে দক্ষ, সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারবে। আর সেই শিক্ষাব্যবস্থাই পারে একটি মেধাভিত্তিক, বিজ্ঞানমনস্ক, আত্মনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

লেখক: শাহাব উদ্দীন মাহমুদ সালমী, সিনিয়র শিক্ষক, গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ