মন্দ ধারণার সুযোগ না দেওয়া: নবীজির জীবন থেকে একটি শিক্ষা
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:১৬ AM

মানব মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত প্রবণতা হলো অনুমাননির্ভরতা। অনেক সময় বাস্তব কোনো ভিত্তি বা স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই মানুষের মনে এমন কিছু অলীক ধারণা জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে ব্যক্তির চিন্তাকে বিষাক্ত করে তোলে।
এই অমূলক ধারণা যখন কথায় কিংবা আচরণে প্রকাশ পায়, তখন পারিবারিক বন্ধন থেকে শুরু করে বৃহত্তর সামাজিক সৌহার্দ্য পর্যন্ত ভেঙে পড়ে।
ইসলাম তাই শুধু মানুষকে মন্দ ধারণা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং এমন সব পরিস্থিতি ও আচরণ সচেতনভাবে এড়িয়ে চলার শিক্ষা দিয়েছে, যা অন্যের মনে সামান্যতম সন্দেহের বীজ বপন করতে পারে।
ইসলাম তাই শুধু মানুষকে মন্দ ধারণা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং এমন সব পরিস্থিতি ও আচরণ সচেতনভাবে এড়িয়ে চলার শিক্ষা দিয়েছে, যা অন্যের মনে সামান্যতম সন্দেহের বীজ বপন করতে পারে।
অর্থাৎ নিজের দিক থেকে শতভাগ নিষ্পাপ থাকার পাশাপাশি অন্যের চোখেও যেন নিজের কর্ম বা অবস্থান নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি না জন্মে—সেই সামাজিক দূরদর্শিতা নিশ্চিত করাই হলো নবীজির জীবনাদর্শ।
মানুষের মন সামান্য কোনো ইঙ্গিতকে অতিরঞ্জিত করে অবচেতনভাবেই পূর্ণাঙ্গ একটি কাল্পনিক দৃশ্যপট তৈরি করে ফেলে। অথচ ধর্ম ও ন্যায়ের বিচারে নিছক ধারণা কখনো অকাট্য সত্যের বিকল্প হতে পারে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো; নিশ্চয়ই কিছু অনুমান সুস্পষ্ট পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং পরস্পরের পেছনে গিবত বা পরনিন্দা কোরো না...।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
এই আয়াতে মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর ব্যাধির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সব ধারণাই নিষিদ্ধ নয়; কিন্তু প্রমাণহীন নেতিবাচক ধারণা মানুষকে অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে। তাই মুমিনের দায়িত্ব হলো কল্পনার ওপর ভর না করে প্রত্যক্ষ সত্যের ওপর আস্থা রাখা এবং অন্যের ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করা।
অন্যের মন থেকে মন্দ ধারণার সামান্যতম সুযোগও কীভাবে প্রজ্ঞার সঙ্গে দূর করতে হয়, রাসুল (সা.) নিজ আচরণের মাধ্যমে তার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
একবার রাসুল (সা.) মসজিদে নববিতে ইতিকাফ অবস্থায় ছিলেন। এক রাতে সাফিয়া (রা.) নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। কিছুক্ষণ আলাপের পর যখন তিনি ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য উঠলেন, তখন নবীজি তাঁকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য সঙ্গে বের হলেন। তাঁর বাসস্থান ছিল ওসামা ইবনে জায়েদের বাড়ির কাছে।
পথিমধ্যে আনসারদের দুজন সাহাবি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নবীজিকে এক নারীর সঙ্গে দেখে দ্রুত কদম ফেলে চলে যেতে লাগলেন। রাসুল (সা.) নিজেই ডেকে তাঁদের বললেন, ‘তোমরা ধীরে চলো, থামো, ইনি আমার স্ত্রী সাফিয়া।’
সাহাবিরা লজ্জিত হয়ে বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ, হে আল্লাহর রাসুল! (আমরা কি আপনার ব্যাপারে কোনো মন্দ চিন্তা করতে পারি?)’
তখন নবীজি (সা.) মানবচরিত্রের এক চূড়ান্ত সত্য উন্মোচন করে বললেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় রক্তের মতো প্রবাহিত হয়। তাই আমি আশঙ্কা করলাম, সে হয়তো তোমাদের অন্তরে কোনো খারাপ ধারণা বা বিভ্রান্তি ঢুকিয়ে দিতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৮১)
এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, নবীজি (সা.) সাহাবিদের ইমান নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেননি; বরং মানুষের দুর্বল মনস্তত্ত্বে শয়তান যেন কোনো কুচিন্তা ঢোকানোর সুযোগ না পায়, সে জন্য তিনি নিজ থেকেই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিলেন। একটি ভুল ধারণা জন্ম নেওয়ার আগেই তার সম্ভাব্য উৎস নির্মূল করাই ছিল এই সুন্নাহর মূল শিক্ষা।
নবীজির স্ত্রী হওয়ায় সাফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করা তাঁর জন্য স্বাভাবিক ছিল। তা সত্ত্বেও নবীজি (সা.) তাঁর পরিচয় সাহাবিদের সামনে পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
ইসলামি আইনশাস্ত্রে এই ঘটনা থেকে এক মৌলিক আদব প্রণীত হয়েছে। মুসলিম শরিফে এই হাদিসের ওপর একটি স্বতন্ত্র অনুচ্ছেদ রয়েছে যে ‘কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রী বা কোনো মাহরাম নারীর সঙ্গে নির্জন বা অস্পষ্ট স্থানে থাকলে এবং তা দেখে পথচারীদের মনে কোনো বিভ্রান্তি বা সন্দেহের অবকাশ থাকলে, তাৎক্ষণিক তার পরিচয় স্পষ্ট করে দেওয়া মোস্তাহাব।’ (শারহু সহিহ মুসলিম, নববি, ১৪/১৫৭)
অর্থাৎ এমন ক্ষেত্রেড ‘আমি তো সৎ আছি, মানুষ যা ভাবে ভাবুক’—এই উদাসীনতা সুন্নতের কথা নয়; বরং আত্মমর্যাদা রক্ষা এবং সমাজকে পাপাচারী চিন্তা থেকে নিরাপদ রাখতে নিজের আচরণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও ইমানের দাবি।
মানুষ বাহ্যিকভাবে যা দেখে, তার পেছনের সত্যটুকু তার অজানা থাকতে পারে। অথচ দৃশ্যমান খণ্ডিত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে রায় দিয়ে দেওয়া বড় ধরনের নৈতিক অপরাধ।
রাসুল (সা.) কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন, ‘তোমরা ভিত্তিহীন অনুমান থেকে বেঁচে থাকো; কেননা কুধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬৪)
কোরআনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে তিনটি পাপকে ক্রমানুসারে নিষিদ্ধ করা হয়েছে: মন্দ ধারণা, ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করা (তাজাসসুস) এবং গিবত।
কারণ, মন্দ ধারণা থেকেই শুরু হয় অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁত খোঁজার অপচেষ্টা, আর সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমাজে শুরু হয় পরনিন্দা ও চরিত্রহনন। তাই মন্দ ধারণার পথ শুরুতেই রুদ্ধ করতে না পারলে তা একসময় গোটা সমাজব্যবস্থায় অনাস্থা ও বিভেদের দেয়াল তৈরি করে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ও দ্রুতগতির জীবনে এই সুন্নতের প্রয়োজনীয়তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর খণ্ডিত আচরণ, পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার ভুল–বোঝাবুঝি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও একটি স্ট্যাটাস বা ছবি দেখে অতিদ্রুত নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া আজ মহামারির রূপ নিয়েছে।
এই সংকট নিরসনে দুটি করণীয় রয়েছে:
প্রথমত, অন্যের যেকোনো অস্পষ্ট আচরণকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা এবং নিশ্চিত না হয়ে কোনো মন্দ সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো।
দ্বিতীয়ত, নিজের কোনো কাজ বা বক্তব্য যদি ভুল ব্যাখ্যা বা সন্দেহের অবকাশ তৈরি করে, তবে অহংকার না করে নিজ দায়িত্বে তা স্পষ্ট ও স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা।
মুমিনের ব্যক্তিত্বে তাকওয়ার পাশাপাশি এমন মনস্তাত্ত্বিক দূরদর্শিতা থাকা অপরিহার্য। নিজেকে সৎ রাখার পাশাপাশি অন্যের মনের পবিত্রতা রক্ষা করার এই সচেতন দায়িত্ববোধই পারস্পরিক আস্থা ও ভালোবাসাপূর্ণ একটি আদর্শ সমাজ নিশ্চিত করতে পারে।
নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
nahidasultana753375@gmail.com
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
ক্ষুধামুক্ত সমাজ গঠনে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ: ইসলামের ১০ শিক্ষা
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৩:১৫ PM · প্রথম আলো
