ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে যন্ত্রাংশের নামে বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার আমদানি
৩১ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:০০ AM

গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দিয়ে বিলাসবহুল বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার ও টয়োটার চারটি দামি গাড়ি আমদানি করেছে একটি প্রতিষ্ঠান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রমতে, এই গাড়িগুলো আমদানি করে ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। আমদানি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর গেন্ডারিয়ায়। কিন্তু সেই ঠিকানায় গিয়ে গাড়ি আমদানিকারক কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি; বরং ২০১৮ সাল থেকেই সেখানে ১২ তলা একটি আবাসিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। তবে এখনো ডাকযোগে সেখানে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে চিঠি যায়।
আমদানি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেওয়া ছিল গেন্ডারিয়ার ৩/১ দীননাথ সেন রোড। গতকাল রোববার দুপুরে সূত্রাপুর এলাকার এ ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। আল-আকসা বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভবনটি নির্মাণ করছে। ২৬ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাটে লোকজনও থাকেন। ভবনের দ্বিতীয় তলায় আবাসন প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়।
আল-আকসা বিল্ডার্সের হিসাবরক্ষক আবদুল কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ২০১৮ সাল থেকে এখানে ভবন নির্মাণ করছি। এখানে কোনো গাড়ির প্রতিষ্ঠান ছিল, এমনটা জানা নেই। তবে আগে এখানে ক্রাউন নামের একটি বাতি তৈরির কারখানা ছিল।’
ভবনটির পাশেই ২০ বছর ধরে মুদিদোকান পরিচালনা করছেন সেলিম স্টোরের মালিক মো. সেলিম মিয়া। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সাতক্ষীরাভিত্তিক ক্রাউন কোম্পানি এখানে অনেক আগে থেকেই বাল্ব তৈরি করত। কিন্তু গত ১০ বছর আগে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে জমিটা আবাসন প্রতিষ্ঠানে দিয়ে দেয় মালিকপক্ষ।
সরেজমিনে ভবনটিতে প্রবেশ করতে চাইলে কথা হয় নিরাপত্তাকর্মী মো হাফিজুল্লাহর সঙ্গে। তিনি এক মাস আগে চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন। তাই আগের বিষয় তিনি জানেন না বলে জানান। পরে দ্বিতীয় তলায় গিয়ে কথা হয় আল-আকসা বিল্ডার্সের হিসাবরক্ষক আবদুল কাইয়ুমের সঙ্গে। তিনি জানান, কোম্পানির কার্যক্রম না থাকলেও ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের নামে চিঠি আসে।
গত বৃহস্পতিবার কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক অভিযানে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা চারটি গাড়ি জব্দ করা হয়। এসব গাড়ির প্রতিটির মূল্য কোটি টাকার বেশি। মোংলা বন্দর দিয়ে এসব গাড়ি আমদানি করা হয়।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, শতভাগ কায়িক পরীক্ষা, বিআরটিএ ও কুয়েটের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আমদানি করা চারটি বিলাসবহুল গাড়ির শুল্ক ফাঁকির ঘটনা উদ্ঘাটন করা হয়।
অস্তিত্ব না থাকলেও ২০১৫ সাল থেকে আমদানি
আমদানিকারকের ঘোষিত ঠিকানায় গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসার অস্তিত্ব পাওয়া না গেলেও প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সাল থেকে নিয়মিত গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে আসছে। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি গাড়ির মোট ২৭টি চালান আমদানি করেছে। এসব চালানের ঘোষিত আমদানিমূল্য ছিল মোট ১ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার।
এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রথম চালান আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় দেড় হাজার ডলার মূল্যের ওই চালানে দুই টন গাড়ির যন্ত্রাংশ আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ওই বছরই প্রতিষ্ঠানটি মোট চারটি চালান আমদানি করে। এরপর বিভিন্ন বছরে এক থেকে ছয়টি পর্যন্ত চালান এসেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে পাঁচটি এবং ২০২৫ সালে ছয়টি চালানে আমদানি করা হয়। প্রতিটি চালানেই আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্যের চেয়ে শুল্কায়নমূল্য বেশি নির্ধারণ করেছে কাস্টমস। কোনো কোনো চালানে এই ব্যবধান ছিল প্রায় দেড় থেকে ছয় গুণ। অর্থাৎ, আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্য কম থাকায় তা গ্রহণ না করে বাস্তব মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন করেছে কাস্টমস।
প্রতিষ্ঠানটি এর আগে খালাস নেওয়া সব চালানই এনেছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এর মধ্যে সাতটি চালান চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপোতে নিয়ে খালাস করা হয়। বাকি চালান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়নের পর খালাস দেওয়া হয়েছে। এসব চালানের পণ্য ঘোষণায় ছিল গাড়ির যন্ত্রাংশ।
তবে এবার প্রথমবারের মতো মোংলা বন্দর দিয়ে আনা চালানটি খালাসের আগেই আটক করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের চালানগুলো খালাসে নিয়োজিত ছিল এম জেড ইন্টারন্যাশনাল। এ বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মাসুদুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
মোংলা বন্দর দিয়ে যন্ত্রাংশ ঘোষণায় আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ি ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের কাছে রপ্তানি করেছে জাপানের আশিকাগা–শি শহরের মাহি কার পোর্ট। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস নেওয়া গাড়ির যন্ত্রাংশের বেশির ভাগ চালানও পাঠিয়েছে একই প্রতিষ্ঠান।
এনবিআরের ডেটাবেজে ২০১৮ সাল থেকে রপ্তানিকারকের তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের একটি ছাড়া বাকি সব চালানের রপ্তানিকারক ছিল মাহি কার পোর্ট। ব্যতিক্রম একটি চালান পাঠিয়েছে দুবাইয়ের মেগাসিটি জেনারেল ট্রেডিং।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একজন গাড়ি ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, জাপানে পুরোনো গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ রপ্তানির ব্যবসার সঙ্গে অনেক বাংলাদেশি যুক্ত রয়েছেন।
মোংলা বন্দরে চারটি গাড়ি জব্দের পর চট্টগ্রামে একটি বিএমডব্লিউ এবং কক্সবাজারে আরও তিনটি গাড়ি জব্দ করেছেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব গাড়ির বৈধ আমদানিসংক্রান্ত নথিপত্র ব্যবহারকারীরা দেখাতে পারেননি।
এ পরিস্থিতিতে একই আমদানিকারকের গত ১২ বছরে খালাস নেওয়া ২৭টি চালানে আসলে কী পণ্য এসেছিল, তা খতিয়ে দেখার বিষয়টি সামনে এসেছে। এ বিষয়ে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
শিল্পে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের দাবি, ১০-২০ বছরের পরিকল্পনার তাগিদ
৩১ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:২২ AM · রাইজিংবিডি
বাথরুম-রান্নাঘরে আধুনিকতার ছোঁয়া, বদলে যাচ্ছে অন্দরসজ্জা
৩০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৪:২০ PM · প্রথম আলো
