শাহজাদপুর সংবাদ

ভারতের একের পর এক শুল্কচাপে বাংলাদেশের পাট খাত

১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৯:৩০ AM

ভারতের একের পর এক শুল্কচাপে বাংলাদেশের পাট খাত

বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানিতে নতুন করে প্রতি টনে ১৪০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত কাউন্টারভেইলিং ডিউটি (সিভিডি) বা ভর্তুকিবিরোধী শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে ভারত। গত সোমবার এই শুল্ক আরোপের চার দিন আগে বাংলাদেশি পাটপণ্যে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে দেশটি।

ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য বিভাগের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজের (ডিজিটিআর) গত সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটপণ্যে পাঁচ বছরের জন্য এই শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সে দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়।

ভারতের ২০২৫ সালের এক তদন্তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাটপণ্যে ভর্তুকি দেওয়ার ১২টি অভিযোগ তোলা হয়।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) ভারতের এভাবে শুল্ক আরোপের উদ্যোগকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছে। সংগঠনটির সভাপতি তাপস প্রামাণিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক কার্যকর থাকার পর কীভাবে আবার সিভিডি আরোপ করা যায়, তা আমার মাথায় আসে না। সরকারের উচিত হবে অযৌক্তিক এ উদ্যোগের প্রতিকার চেয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নালিশ করা।’

ডিজিটিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তে বাংলাদেশের ২৪টি পাটকল সহযোগিতা করেছে। ছয় প্রতিষ্ঠানকে তিনটি রপ্তানিকারক গ্রুপে ভাগ করে তাদের জন্য আলাদা শুল্কহার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কহার প্রতি টনে ১০১ দশমিক ৫৪ থেকে ১৩২ দশমিক ৩৬ ডলার। সহযোগিতা করা বাকি ১৮টি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১১৬ দশমিক ৪৮ ডলার। আর তদন্তে সহযোগিতা না করা বাংলাদেশের অন্য সব পাটপণ্য রপ্তানিকারকের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে ১৪০ দশমিক শূন্য ৪ ডলার। নেপালের রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে শুল্কহার ৫৪ দশমিক ৭৭ থেকে ৬০ দশমিক ৫৪ ডলার।

ভারত গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি পাটপণ্য আমদানিতে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। এর আগে বাংলাদেশ ও নেপালের পাটের সুতা ও টুইন, হেসিয়ান কাপড় ও পাটের স্যাকিং ব্যাগে প্রতি টনে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক ছিল। পরে বাংলাদেশি পাটের স্যাকিং কাপড়ও এর আওতায় আনা হয়।

ডিজিটিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমে ১ লাখ ১৭ হাজার টনে নেমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২০–২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ১১৬ কোটি ডলার আয় করেছিল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে ৮২ কোটি ডলারে নামে। তবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রপ্তানি ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়।

বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) চেয়ারম্যান মো. আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারত গায়ের জোরে এগুলো করছে। বাংলাদেশের পাট খাতকে ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে আছে দেশটি। আমি মনে করি, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথাযথ কোনো প্রতিবাদ করা হয় না বলে একধরনের সুযোগ নিচ্ছে তারা। এ ব্যাপারে সরকার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিক।’

ভারতে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যে ভর্তুকির অভিযোগ এবং এ নিয়ে সিভিডি আরোপের উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছে বাংলাদেশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভারতীয় তদন্তের আইনগত ভিত্তি, ভর্তুকির হিসাব, ক্ষতির তথ্য এবং সম্ভাব্য দ্বৈত প্রতিকারের বিষয়ে লিখিতভাবে ডিজিটিআরের কাছে আপত্তি জানিয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, পাটপণ্যের ওপর ভারতের অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে এখনো কার্যকর। একই পণ্যে আবার ভর্তুকির অভিযোগে সিভিডি আরোপের উদ্যোগ মূলত ‘ডাবল রেমেডি’ বা একই পরিস্থিতির জন্য দ্বৈত প্রতিকার।

এ ছাড়া বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানিতে ভারতের বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে জারি করা বিধিনিষেধের ফলে বাংলাদেশের পাটপণ্য শুধু নাভা শেভা সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ভর্তুকি ও প্রতিকারসংক্রান্ত চুক্তির বিভিন্ন ধারা এবং ভারতের কাস্টমস ট্যারিফ আইনের ৯বি ধারার উল্লেখ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, একই পরিস্থিতির জন্য অ্যান্টি–ডাম্পিং ও সিভিডি একসঙ্গে আরোপ করা যায় না। সে জন্য ডিজিটিআরকে চলমান সিভিডি তদন্তের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তা বন্ধ করার অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ।

বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিভিডির তদন্ত থেকে সরে আসতে লিখিতভাবে ভারতকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দিল্লিতে দুই দেশের যৌথ কার্যদলের বৈঠক রয়েছে। সে বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে পাটপণ্যে অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক আরোপ ও সিভিডি আরোপের উদ্যোগের বিষয়টি রেখেছি। আশা করছি, সমাধানের উপায় বের হবে।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ