শাহজাদপুর সংবাদ

ভারত–পাকিস্তান দুই দেশেই রাজত্ব, পারিশ্রমিক ছিল সবার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৫৯ AM

ভারত–পাকিস্তান দুই দেশেই রাজত্ব, পারিশ্রমিক ছিল সবার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি

একসময় তাঁর কণ্ঠ শুনে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন পরিবারের একজন—এই মেয়েই একদিন পরিবারের ভাগ্য বদলে দেবে। কথাটা যে এত দ্রুত সত্যি হবে, তখন হয়তো কেউ ভাবেননি। মাত্র ছয় বছর বয়সে গান শেখা শুরু করা সেই মেয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই মঞ্চে উঠলেন, শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে এলেন, তারপর নায়িকা হলেন। মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে এমন জনপ্রিয়তা পেলেন যে দেশভাগের সময় তিনি যখন ভারত ছাড়লেন, তখন পেছনে রেখে গেলেন প্রতিষ্ঠিত এক তারকার জীবন। কিন্তু তাঁর গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়টি তখনো বাকি।

নতুন দেশ পাকিস্তানে গিয়ে তাঁকে আবার শুরু করতে হয়েছিল। সেই দেশ তখন নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলার লড়াইয়ে। সেখানে নূরজাহান শুধু গান গেয়ে বা অভিনয় করে থেমে থাকেননি; প্রযোজনা করেছেন, স্টুডিও গড়েছেন, পরিচালনায় এসেছেন, নিজের পারিশ্রমিক নিজে নির্ধারণ করেছেন। পরে অভিনয় ছেড়ে পুরোপুরি সংগীতে মন দেন। আর সেই সংগীতই তাঁকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’—সুরের রানি।

আজ নূরজাহানের জন্মের ১০০ বছর। ১৯২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাসুরে জন্মেছিলেন নূরজাহান। সংগীত পরিবারে জন্ম নেওয়া মেয়েটি পরবর্তী সময়ে শুধু পাকিস্তানের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতের ইতিহাসে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেন।

ছয় বছর বয়সে শুরু নূরজাহানের জন্ম এমন একটি পরিবারে, যেখানে গান ছিল জীবনেরই অংশ। তাঁর বাবা মাদাদ আলী ছিলেন সংগীতের সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের আরও কয়েকজন নারী মঞ্চে কাজ করতেন। ছোট বয়সেই নূরজাহানের কণ্ঠে অসাধারণ সম্ভাবনা দেখতে পান পরিবারের মানুষ। ছয় বছর বয়স থেকেই তাঁর সংগীতের তালিম শুরু হয়। পরে কলকাতায় গিয়ে তিনি সংগীতের আরও বড় পরিসর পান।

শিশুশিল্পী হিসেবে তখনই পরিচিতি তৈরি হয় ‘বেবি নূরজাহান’ নামে। মঞ্চ ও চলচ্চিত্র—দুই জায়গাতেই তাঁর চলাফেরা শুরু হয় অল্প বয়সে। ১৯৩৫ সালের ‘পিন্ড দি কুড়ি’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর পাঞ্জাবি ও উর্দু চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ বাড়তে থাকে।

নূরজাহানের বেড়ে ওঠাটা ছিল অস্বাভাবিক দ্রুত। যে বয়সে অন্য শিশুরা স্কুল, খেলাধুলা আর পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, সেই বয়সে নূরজাহান স্টুডিও, মঞ্চ, রেকর্ডিং আর ক্যামেরার সামনে কাজ করছেন।

১৯৩৮ সালে ‘গুল বাকাওলি’ ছবির জন্য নূরজাহান গান রেকর্ড করেন। সেটিই চলচ্চিত্রের জন্য তাঁর প্রথম দিককার উল্লেখযোগ্য গানগুলোর একটি। কয়েক দশক পরও তাঁর শেষ রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে এই শুরুর সময়ের আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়—গানের ভুবনে প্রবেশ করেছিলেন শিশুশিল্পী হিসেবে, আর জীবনের শেষ দিক পর্যন্ত কণ্ঠসংগীত থেকে দূরে যাননি।

মুম্বাইয়ে নূরজাহানের উত্থানকলকাতার পর নূরজাহানের ক্যারিয়ার তাঁকে নিয়ে যায় লাহোর ও মুম্বাইয়ে। চল্লিশের দশকে মুম্বাই ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে পৌঁছে নূরজাহান আর শিশুশিল্পী থাকলেন না; হয়ে উঠলেন পূর্ণাঙ্গ নায়িকা ও গায়িকা।১৯৪২ সালের ‘খানদান’ নূরজাহানের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর গানের জনপ্রিয়তাও তাঁকে দ্রুত বড় তারকায় পরিণত করে। এরপর একে একে আসে ‘জিনাত’, ‘আনমোল ঘড়ি’ ও ‘জুগনু’র মতো ছবি।

১৯৪৫ সালের ‘জিনাত’-এর একটি গান নূরজাহানকে বিশেষভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে। ‘বুলবুলো মাত রো’ গানটির মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠের যে শক্তি প্রকাশ পেয়েছিল, সেটি পরবর্তী সময়ে তাঁকে ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’ উপাধির সঙ্গে যুক্ত করে।‘আনমোল ঘড়ি’তে সুরের সঙ্গে নূরজাহানের অভিনয় ও উপস্থিতি তাঁকে আরও বড় তারকায় পরিণত করে। আর ১৯৪৭ সালের ‘জুগনু’তে দিলীপ কুমারের বিপরীতে তাঁর অভিনয় তাঁকে তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সারির নায়িকাদের একজন করে দেয়।সব ছেড়ে নতুন দেশে১৯৪৭। ভারত ভাগ হলো। লাখ লাখ মানুষের মতো নূরজাহানের জীবনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বদলে গেল। স্বামী ও চলচ্চিত্র পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পাকিস্তানে চলে গেলেন।

এ সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বোঝা যায় তখনকার পরিস্থিতি মনে রাখলে। পাকিস্তানের নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্প তখনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি। দেশভাগের ফলে শিল্পী, প্রযুক্তিবিদ, প্রযোজক ও অর্থ—সবকিছুরই ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। লাহোরকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্র বানানোর স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মতো পরিকাঠামো তখন খুব সীমিত। নূরজাহান সেখানে গিয়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করলেন।

কিন্তু এবার নূরজাহান শুধু শিল্পী নন। তিনি জানতেন চলচ্চিত্র কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে তারকা তৈরি হয়, কীভাবে দর্শককে হলে টানা যায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতা নতুন দেশের শিল্পে কাজে লাগালেন। ১৯৫১ সালে মুক্তি পেল ‘চানভে’। ছবিতে নূরজাহান অভিনয় করেন, গান করেন এবং পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এর ফলে পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

এটি ছিল নূরজাহানের ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক, যেটি আজ তাঁর গানের জনপ্রিয়তার আড়ালে অনেক সময় চাপা পড়ে যায়।

নায়িকা থেকে কণ্ঠের সম্রাজ্ঞী‘চানভে’র পর ‘দুপাট্টা’, ‘পাতে খান’, ‘ইন্তেজার’, ‘আনারকলি’, ‘কোয়েল’—একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন নূরজাহান। ‘কোয়েল’ বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে তাঁর অভিনয় ও গানের জন্য। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে এসে তিনি বুঝতে শুরু করেন, পর্দায় অভিনয় করার চেয়ে তাঁর কণ্ঠের জন্যই মানুষের অপেক্ষা বেশি। তাই অভিনয় ছেড়ে দিলেন।

এ সিদ্ধান্তও ছিল সাহসী। তখন একজন নারী তারকা নিজের জনপ্রিয় অভিনয় ক্যারিয়ার নিজে থেকে গুটিয়ে শুধু গানের ওপর নির্ভর করবেন—এটা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু নূরজাহান নিজের শক্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ছিলেন।১৯৫৯ সালের পর নূরজাহানের অভিনয়জীবন কার্যত শেষ হয়ে যায়। ‘গালিব’ ছিল তাঁর শেষ দিকের চলচ্চিত্র অভিনয়ের একটি। এরপর তিনি হয়ে উঠলেন মূলত প্লেব্যাক ও গজলশিল্পী। এবার তাঁর সামনে ছিল অন্য রকম এক সাম্রাজ্য। স্টুডিওতে নায়িকার মুখে গান শোনানোর বদলে তাঁর নিজের কণ্ঠই হয়ে উঠল চলচ্চিত্রের আবেগ। নায়িকার ঠোঁটে গান, কিন্তু দর্শকের মনে কণ্ঠ—নূরজাহানের।

অন্যদের চেয়ে পাঁচ গুণ পারিশ্রমিকপাকিস্তানি চলচ্চিত্রে যখন অন্য অনেক গায়িকা একটি গানের জন্য প্রায় ৩৫০ রুপি পারিশ্রমিক পেতেন, নূরজাহান দাবি করতেন প্রায় ২ হাজার রুপি। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল প্রায় পাঁচ গুণ। আজকের চোখে সংখ্যাটি হয়তো খুব বড় মনে হবে না। কিন্তু সেই সময়ের চলচ্চিত্রশিল্পে এই পার্থক্য ছিল বিরাট। এটি শুধু তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়; শিল্পী হিসেবে নিজের মূল্য সম্পর্কে তাঁর ধারণাটিও বোঝায়।নূরজাহান জানতেন, তাঁর কণ্ঠ একটি ছবির বাণিজ্যিক আকর্ষণ। তাই নিজের শ্রমের মূল্য নির্ধারণে তিনি অন্যদের অনুসরণ করেননি।

নূরজাহানের ব্যক্তিত্ব নিয়েও তখন নানা গল্প ছড়িয়ে ছিল। নিজের স্টুডিওতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কর্তৃত্বপূর্ণ। প্রযোজক থেকে পরিচালক—কাজের জায়গায় নিজের অবস্থান নিয়ে আপস করতে তিনি খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। এই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে তাঁর সময়ের পুরুষপ্রধান চলচ্চিত্রজগতে আলাদা করে দিয়েছিল।

সংসার, বিচ্ছেদ এবং নিজের মতো করে বাঁচানূরজাহানের ব্যক্তিজীবনও ছিল সিনেমার গল্পের মতোই ঘটনাবহুল। মাত্র ১৭ বছর বয়সে শওকত হুসেইন রিজভিকে বিয়ে করেন। স্বামী ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক। দুজনের সম্পর্কের সঙ্গে কাজও জড়িয়ে ছিল। তাঁদের সংসারে সন্তান আসে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই দাম্পত্য ভেঙে যায়।

১৯৫৯ সালে নূরজাহান দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন অভিনেতা এজাজ দুররানিকে। এই বিয়ের পর তাঁর অভিনয়জীবনও শেষের দিকে চলে আসে। দ্বিতীয় স্বামী তাঁর অভিনয় চালিয়ে যাওয়া নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে পর্দা থেকে সরে গেলেও সংগীত থেকে সরেননি নূরজাহান; বরং তখনই তাঁর কণ্ঠ আরও স্বাধীন হয়ে ওঠে।

ছয় সন্তানের মা হয়েও নিজের পেশাগত পরিচয়কে নূরজাহান আলাদা করে রেখেছিলেন। পরিবার ও কাজ—দুটোকেই নিজের মতো করে সামলানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর জীবনের এই দিক তাঁকে শুধু তারকা নয়, নিজের সময়ের এক শক্তিশালী নারী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও আলাদা করে।

ফয়েজের কবিতা, নূরজাহানের কণ্ঠনূরজাহানের কণ্ঠের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি শুধু সুর গাইতেন না, শব্দের আবেগও গাইতেন। এ কারণেই কবিদের সঙ্গে তাঁর কাজ এত স্মরণীয়।ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ‘মুঝসে পেহলি সি মোহাব্বত’ নূরজাহানের কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছিল। কবিতার প্রেম, হতাশা ও সামাজিক বোধ—সবকিছু তাঁর গলায় যেন একসঙ্গে ধরা পড়েছিল। একটি চলচ্চিত্রের গান কীভাবে কবিতাকে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে দিতে পারে, তার বড় উদাহরণ এটি। নূরজাহানের গানের তালিকায় ছিল প্রেম, বিরহ, গজল, লোকগীতি, চলচ্চিত্রের রোমান্টিক গান—আবার ছিল দেশাত্মবোধক গানও।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় নূরজাহানের কণ্ঠ অন্য এক ভূমিকা নেয়। রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত দেশাত্মবোধক গান দিয়ে তিনি পাকিস্তানি মানুষের মধ্যে যুদ্ধকালীন আবেগ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সেই গানগুলো পরে পাকিস্তানের সংগীত-ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সেই সময় নূরজাহানের কণ্ঠ আর কেবল সিনেমার নায়িকার কণ্ঠ ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল জাতীয় আবেগের কণ্ঠ।

লতার আদর্শ ছিলেন নূরজাহানভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের সংগীত ইতিহাসে নূরজাহান ও লতা মঙ্গেশকরের নাম প্রায় পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে।

দুজনকে নিয়ে তুলনা হয়েছে বহুবার। কিন্তু নূরজাহানের প্রতি লতার শ্রদ্ধা ছিল প্রকাশ্য। লতা নিজেই জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকে নূরজাহানের গান শুনে তিনি বড় হয়েছেন এবং নূরজাহান তাঁর আদর্শ ছিলেন। এই স্বীকৃতির গুরুত্ব আলাদা।কারণ, দুই শিল্পীর ক্যারিয়ার দেশভাগের পর দুই রাষ্ট্রে আলাদা পথে এগিয়েছে। তবু একজনের শিল্প অন্যজনের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থেকেছে। সীমান্ত, রাজনীতি কিংবা দুই দেশের সম্পর্ক—কোনোটিই সংগীতের এই আদান-প্রদানকে পুরোপুরি থামাতে পারেনি।

একবার ফিরে এসেছিলেন ভারতেদীর্ঘ বিরতির পর ১৯৮২ সালে নূরজাহান ভারতে গিয়েছিলেন। দেশভাগের পর সেটিই ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য সীমান্তপারের সফরগুলোর একটি। তত দিনে তিনি পাকিস্তানে কিংবদন্তি। কিন্তু ভারতে তাঁর পুরোনো শ্রোতাদের স্মৃতিও তখনো অমলিন।এ যেন নিজের পুরোনো জীবনের কাছে ফিরে যাওয়া। যে মুম্বাই একসময় তাঁকে তারকা বানিয়েছিল, যে ভারতীয় চলচ্চিত্রে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় কাটিয়েছিলেন, সেই ভূখণ্ডে তিনি ফিরলেন কয়েক দশক পর। কিন্তু এবার তিনি শুধু পুরোনো নূরজাহান নন; সঙ্গে ছিল পাকিস্তানের ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’ পরিচয়।১০ হাজার গানের কিংবদন্তিনূরজাহানের গান কতটি—এ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে আলাদা হিসাব পাওয়া যায়। কোনো সূত্রে কয়েক হাজার, আবার কোনো সূত্রে প্রায় ১০ হাজার গানের কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তানি সরকারি সূত্রও প্রায় ১০ হাজার গানের সংখ্যা উল্লেখ করেছে। সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে দ্বিমত নেই—তাঁর কণ্ঠের ব্যাপ্তি ছিল অসাধারণ! উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধিসহ বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।

আর সবচেয়ে বড় বিষয়, নূরজাহান কেবল গান গাইতেন না—গানের ভেতরের চরিত্রটিকেও নিজের কণ্ঠে ধারণ করতেন। এ কারণেই তাঁর পুরোনো গান নতুন প্রজন্মের কাছেও বারবার ফিরে আসে।

শেষ গান পর্যন্ত মঞ্চেজীবনের শেষ দশকেও নূরজাহান সংগীত থেকে দূরে যাননি। ১৯৯৬ সালে তাঁর শেষ রেকর্ডিংয়ের কথা উল্লেখ করেছে ডন। অর্থাৎ শৈশব থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত সেই কণ্ঠসংগীত তাঁর সঙ্গে ছিল। ২০০০ সালের ২৩ ডিসেম্বর করাচিতে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান নূরজাহান। বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

একজন দরিদ্র সংগীতশিল্পীর পরিবারের ছোট্ট মেয়ে থেকে শিশুশিল্পী; সেখান থেকে মুম্বাইয়ের নায়িকা; তারপর দেশভাগে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত; নতুন দেশে গিয়ে আবার নিজের সাম্রাজ্য তৈরি—নূরজাহের জীবন ছিল সিনেমার মতোই।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ডন ও ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ