শাহজাদপুর সংবাদ

ব্যাংকিং শুধু ব্যালান্স শিটের ব্যবসা নয়, এটি আস্থার ব্যবসা

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:০৮ PM

ব্যাংকিং শুধু ব্যালান্স শিটের ব্যবসা নয়, এটি আস্থার ব্যবসা

ব্যাংকিং বাজারে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে আপনারা কোন দিকে জোর দিচ্ছেন?

কে এম আওলাদ হোসেন: আমাদের কাছে ব্যাংকিং শুধু ব্যালান্স শিটের ব্যবসা নয়, এটি আস্থার ব্যবসা। একটি নতুন ব্যাংক হিসেবে আমরা শুধু ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চাই না। আমরা এমন একটি ব্যবসায়িক ভিত্তি তৈরি করতে চাই, যার ভিত্তি হবে মানসম্পন্ন সম্পদ, অর্থবহ ব্যাংক, গ্রাহক সম্পর্ক এবং সুশৃঙ্খল প্রবৃদ্ধি।

আমাদের কৌশলগত লক্ষ্য হচ্ছে করপোরেট সিএমএসএমই, ট্রেড ফাইন্যান্স, রিটেইল ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ইকোসিস্টেম তৈরি করা। আমরা গ্রাহকের শুধু ব্যাংকিং প্রয়োজন পূরণ করতে চাই না; আমরা তার ব্যবসায়িক যাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে একজন বিশ্বস্ত আর্থিক অংশীদার হতে চাই। আমাদের দর্শন খুবই সহজ, উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রবৃদ্ধি, সুশৃঙ্খল সম্প্রসারণ।

ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সহজে পরিচালন মূলধন ও বাণিজ্যের ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া কেমন?

কে এম আওলাদ হোসেন: এসএমই অর্থায়নের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের মধ্যে একই সঙ্গে ভারসাম্য করতে হয়। তা হলো গতি ও শৃঙ্খলা। একজন উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক সুযোগ অপেক্ষা করে না। তাই অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব তার ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু গতির জন্য কখনোই ঋণ প্রদানের শৃঙ্খলা বিসর্জন দেওয়া যাবে না।

আমরা গ্রাহকের ব্যবসার ধরন, লেনদেনের আচরণ, নগদ প্রবাহ, বাজারে অবস্থান, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও অর্থায়নের ব্যবহার বিবেচনা করি। প্রযুক্তি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে। উন্নত তথ্য, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর ক্রেডিট মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করতে পারি।

তবে চূড়ান্ত উদ্দেশ্য শুধু দ্রুত ঋণ অনুমোদন নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো সঠিক গ্রাহকের সঠিক প্রয়োজনের জন্য সঠিক অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা। আমি এটিকে বলি দ্রুত ব্যাংকিং, সঠিক ব্যাংকিং। কারণ, দায়িত্বশীল ব্যাংকিংয়ের অর্থ ধীরগতির ব্যাংকিং নয়। আবার দ্রুত ব্যাংকিংয়ের অর্থ দায়িত্বহীন ব্যাংকিংও নয়।

খেলাপি ঋণের প্রবণতা এড়াতে কী ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

কে এম আওলাদ হোসেন: খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা ঋণ বিতরণের পরে শুরু হয় না; এটি ঋণ অনুমোদনের আগেই শুরু হয়। ভালো ঋণ প্রদানের প্রথম শর্ত হলো গ্রাহককে ভালোভাবে বোঝা। শুধু জামানত দেখে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। ব্যবসার নগদ প্রবাহ, উদ্যোক্তার পূর্ববর্তী রেকর্ড, শিল্প খাতের গতিশীলতা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ঋণের ব্যবহার বুঝতে হবে।

এরপর আসে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ। আমরা ক্রেডিট মূল্যায়ন, পোর্টফোলিও তদারকি, ঋণ বিতরণ–পরবর্তী পর্যালোচনা ও ঋণ আদায় ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত ক্রেডিট শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে দেখি।

ব্যবসায়ীদের কাজের গতি বাড়াতে ও কাগজবিহীন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ভূমিকা কী?

কে এম আওলাদ হোসেন: ডিজিটাল ব্যাংকিং বলতে আমরা শুধু একটি মোবাইল অ্যাপ বা অনলাইন লেনদেন বুঝি না। আমরা গ্রাহকের সম্পূর্ণ যাত্রাকে দেখি অনবোর্ডিং থেকে লেনদেন, ডকুমেন্টেশন থেকে সেবা প্রদান এবং প্রয়োজন হলে মানুষের সহায়তা পর্যন্ত।

কাগজবিহীন ডকুমেন্টেশন, ডিজিটাল অনবোর্ডিং, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ট্রেড সেবা গ্রাহকের সময় ও পরিচালন ব্যয় কমাতে পারে। ট্রেড ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিং, কাঠামোবদ্ধ ট্রেড ডেটা ও ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার টেকনোলজি ভবিষ্যতে বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে তথ্যের নিরাপদ ও উৎস চিহ্নিতকরণ যোগ্য তথ্যপ্রবাহ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রযুক্তির প্রকৃত মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন এটি গ্রাহকের জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা কমায়। প্রযুক্তি গ্রাহকের কাজ সহজ করবে; আর যেখানে বিচার-বিবেচনা, জটিলতা বা আস্থার প্রয়োজন হবে, সেখানে মানুষ গ্রাহকের পাশে থাকবে।

সাইবার প্রতারণা প্রতিরোধ ও ব্যবসার তথ্য সুরক্ষায় ব্যাংকের বিনিয়োগ কেমন?

কে এম আওলাদ হোসেন: ডিজিটাল ব্যাংকিং যত বাড়বে, ট্রাস্ট আর্কিটেকচারের গুরুত্বও তত বাড়বে। আজকের দিনে সাইবার নিরাপত্তা শুধু আইটি বিভাগের দায়িত্ব নয়। এটি ব্যবসায়িক ঝুঁকি, পরিচালন ঝুঁকি ও গ্রাহকের আস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

আমাদের কাছে নিরাপত্তার তিনটি মাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—পিপল, প্রক্রিয়া ও প্রযুক্তি। প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ, অ্যাকসেস ব্যবস্থাপনা, লেনদেন তদারকি এবং সিস্টেম সুরক্ষার পাশাপাশি কর্মী সচেতনতা এবং গ্রাহক সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো ব্যবস্থায় অর্থায়ন ও ডিজিটাল অর্থায়নের মেলবন্ধন কীভাবে ঘটাবেন?

কে এম আওলাদ হোসেন: প্রথাগত ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ব্যাংকিংকে পরস্পরের প্রতিযোগী মডেল হিসেবে দেখি না। আমি দুটিকে একটি সমন্বিত ব্যাংকিং অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে দেখি।

আমদানি অর্থায়ন, রপ্তানি অর্থায়ন, চলতি মূলধন এবং গ্যারান্টির মতো প্রচলিত ব্যাংকিং পণ্য আগামী দিনেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কিন্তু গ্রাহকের যাত্রা, ডকুমেন্টেশন, লেনদেন তদারকি, যোগাযোগ ও সেবা প্রদান আরও ডিজিটাল হতে হবে।

একজন উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত যদি দ্রুত হয়, তাহলে ব্যাংকিং সহায়তাকেও সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।

এআই গ্রাহকের তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, বিভিন্ন ধরন শনাক্ত করতে পারে এবং কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যথাযথ মানবিক তদারকি, সুশাসন ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ