শাহজাদপুর সংবাদ

ব্যাংক খাত সংস্কারে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১,৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৮:৩০ AM

ব্যাংক খাত সংস্কারে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১,৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প

দেশের ব্যাংক খাতের সংস্কার, তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদারে নতুন প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা।

পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যাংক পুনর্গঠন, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের সংস্কারে সহায়তা করা হবে। ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২) শীর্ষক এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঢাকায় সচিবালয়ে আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি তোলার কথা রয়েছে। এদিন এটিসহ অনুমোদনের জন্য কার্যতালিকায় মোট ১৫টি প্রকল্প রাখা হয়েছে।

প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা দেবে। বাকি ১৪ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে আসবে। এর মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।

এ নিয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করতে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। এটার মাধ্যমে ব্যাংক খাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ক্রয় কার্যক্রম আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্বচ্ছ করা হবে। তা ছাড়া নীতিগত পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হবে।’

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দুর্বলতা ভুগছে। কিছু ব্যাংক তারল্য ও মূলধনসংকটের মুখোমুখি রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আর্থিক খাতের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে আগের ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের এ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়াতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, প্রযুক্তিসামগ্রী, সফটওয়্যার ও ডেটাবেজ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের তদারকির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে পরামর্শক সেবা নেওয়া হবে।

প্রকল্পটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ব্যাংক খাতের তদারকি সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার করা হবে। তৃতীয় ধাপে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।

প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো, ব্যাংক খাতের আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা। এ জন্য আমানত বিমা তহবিলের (ডিআইটিএফ) আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক অবসায়ন বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, তাঁদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সময় কমানো এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহায়তা দেওয়া হবে।

এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। ব্যাংক পুনর্গঠন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্ত (পিবিসি) ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত কার্যক্রম ও ফলাফলের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের সারসংক্ষেপে দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতার বিষয়গুলো তুলে ধরে বলা হয়েছে, কিছু ব্যাংক বিশেষ করে সরকারি ও ইসলামি ব্যাংকগুলো তারল্য ও মূলধনসংকটে পড়েছে। কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো ও সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাংক খাতের তদারকি কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। সাইবার হামলা ও আন্তসীমান্ত আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও এসব সীমাবদ্ধতা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এ প্রকল্পের ব্যয়ের বড় অংশ রাখা হয়েছে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নে। এর মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনার জন্য ৭১১ কোটি টাকা এবং কম্পিউটার সফটওয়্যার কিনতে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ, পরামর্শক নিয়োগ, ডেটাবেজ ও অন্যান্য প্রযুক্তিসামগ্রী কেনার জন্যও অর্থ রাখা হয়েছে।

প্রশিক্ষণের জন্য প্রকল্পে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এ খাতে ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ব্যক্তি পরামর্শক নিয়োগে ২৯ কোটি টাকা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক সেবায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।

প্রকল্পটির প্রস্তাব পর্যালোচনা করে পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার ও ব্যাংক পুনর্গঠন কার্যক্রমে সহায়তা পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বাস্তবায়িত ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের প্রথম পর্যায় ২০১৫ সালে অনুমোদিত হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের মার্চে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ২৬২ মিলিয়ন ডলার।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পে তিনটি প্রধান কাজ করা হয়। এগুলো হলো আর্থিক খাতের ডিজিটাল অবকাঠামো, ব্যাসেল কোর মূলনীতি (প্রিন্সিপালস) অনুসরণ করে

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তবে শুধু প্রযুক্তি কিনলেই ব্যাংক খাতের সমস্যার সমাধান হবে না। এর কার্যকর ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবলও তৈরি করতে হবে।’

এই অর্থনীতিবিদ প্রকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে জোর দেন।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ