বিশ্বকাপ থেকে বড় ক্লাবে সুযোগ পেয়েছেন যে খেলোয়াড়েরা
১১ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:০০ AM

বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার বদলে দিয়েছে। সম্প্রতি কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া চিলির ক্লাব কোলো-কোলোতে যোগ দিয়েছেন। এর আগে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের ফো লঁসে, ২০০২ সালে গিলবার্তো সিলভা আর্সেনালে, ২০০৬ সালে মাচেরানো ওয়েস্ট হামে, ২০১০ সালে ওজিল রিয়াল মাদ্রিদে এবং হামেস রদ্রিগেজ ২০১৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমান। এনজো ফার্নান্দেজের মতো অনেকেই বিশ্বকাপের পর বড় দলবদল করেছেন।
ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই উন্মাদনা, চোখের পলকে নায়ক বনে যাওয়ার সুযোগ। মাসব্যাপী চলা এই মেলায় বিশ্বের বাঘা বাঘা ক্লাবগুলো রীতিমতো ছিপ ফেলে বসে থাকে। কে কোথায় একটা দারুণ গোল করল, কে কেমন ট্যাকল করল, কে ভালো গোল সেভ করল—এসব নিয়ে চলে হিসাব–নিকাশ। আর সেই পারফরম্যান্সের জাদুতে রাতারাতি বদলে যায় অনেক খেলোয়াড়ের জীবন।
এই যেমন ধরো কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার কথা! সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপে দারুণ পারফর্ম করে পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগ থেকে সরাসরি চিলির সবচেয়ে বড় ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তবে শুধু ভোজিনিয়াই নন, বিশ্বকাপের জাদুতে রাতারাতি বড় ক্লাবে পাড়ি জমানোর এই গল্প ফুটবলে বেশ পুরোনো। চলো, আজ এমন কয়েকজন তারকার গল্প শোনা যাক, যাঁদের ক্যারিয়ারের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছিল বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স।
মার্ক-ভিভিয়েন ফো
১৯৯৪ বিশ্বকাপের আগে ক্যামেরুনের এই মিডফিল্ডারের নাম কজনই–বা জানতেন! সেই বিশ্বকাপে ক্যামেরুন দল হিসেবে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই ফো ঠিকই আলো ছড়িয়েছিলেন। বিশেষ করে ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ইউরোপিয়ান স্কাউটদের নজর কেড়ে নেয়। ব্যস, ক্যামেরুনের ক্যানন ইয়াউন্দে ক্লাব থেকে তিনি ফ্রি ট্রান্সফারে সোজা পাড়ি জমান ফরাসি ক্লাব লঁসে! লঁসে কাটানো চার বছরে তিনি ক্লাবটিকে ১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে তাদের প্রথম লিগ শিরোপাও জিতিয়েছিলেন। এরপর ওয়েস্ট হাম, ম্যানচেস্টার সিটি ও লিঁওর মতো ক্লাবে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন। তবে ২০০৩ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে কনফেডারেশন কাপের সেমিফাইনালে মাঠে লুটিয়ে পড়ে তাঁর সেই মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা ফুটবল বিশ্ব আজও ভুলতে পারেনি। ম্যাচের ৭২ মিনিটে হঠাৎ মাঠের মাঝখানে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান তিনি। দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি। পরে জানা যায়, তাঁর হৃদ্যন্ত্রে সমস্যা হয়েছিল। এই রোগের নাম হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি। হৃদ্যন্ত্রের পেশি অস্বাভাবিকভাবে পুরু হয়ে যাওয়ার একটি রোগ এটি। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর।
গিলবার্তো সিলভা
২০০২ সালে বিশ্বকাপের আসর বসেছিল দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে। ২৫ বছর বয়সী গিলবার্তো সিলভা তখন খেলেন ব্রাজিলের অ্যাটলেটিকো মিনেইরোতে। ব্রাজিলের অধিনায়ক এমারসন ইনজুরিতে না পড়লে হয়তো গিলবার্তোর প্রথম একাদশেই জায়গা হতো না! কিন্তু সুযোগ পেয়ে সেটার কী দারুণ সদ্ব্যবহারটাই না তিনি করলেন। লুইজ ফেলিপে স্কলারির দলের হয়ে প্রতিটি ম্যাচের প্রতিটি মিনিট মাঠে ছিলেন তিনি। শেষে বাড়ি ফিরলেন বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে। তাঁর এই জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখে আর্সেনাল দেরি করেনি। প্রায় ৪৫ লাখ পাউন্ড খরচ করে দ্য ইনভিজিবল ওয়ালখ্যাত এই মিডফিল্ডারকে দলে টানে তারা। এরপরের গল্পটা তো ইতিহাস! আর্সেনালের সেই বিখ্যাত ২০০৩-০৪ মৌসুমের অপরাজিত দলের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন তিনি।
হাভিয়ের মাচেরানো
বয়স তখন মাত্র ২২। ২০০৬ বিশ্বকাপে আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা জানান দিলেন আর্জেন্টিনার এই লড়াকু মিডফিল্ডার। তাঁর কাঁধে ভর করেই আর্জেন্টিনা সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। ব্রাজিলের করিন্থিয়ান্সে খেলা এই তরুণের ওপর নজর পড়ে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর। মজার ব্যাপার হলো মাচেরানো নিজে চেয়েছিলেন করিন্থিয়ান্সেই থেকে যেতে, যাতে ক্লাবটিকে অবনমনের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন! কিন্তু ইউরোপের ডাক কি আর সহজে ফেরানো যায়? ২০০৬ সালের গ্রীষ্মে আরেক আর্জেন্টাইন সতীর্থ কার্লোস তেভেজকে নিয়ে তিনি যোগ দেন ওয়েস্ট হাম ইউনাইটেডে। সেখানে বছরখানেক কাটিয়েই পাড়ি জমান লিভারপুলে, আর তারপর ২০১০ সালে সোজা বার্সেলোনায়। সেখানে তিনি দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ আর পাঁচটি লা লিগাসহ সম্ভাব্য সবকিছুই জিতেছেন।
মেসুত ওজিল
২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানি তৃতীয় হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পুরো বিশ্বের চোখ কপালে তুলে দিয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী এক তরুণ প্লে-মেকার। ৭ ম্যাচে ৪ গোল আর ৪টি অ্যাসিস্ট! মেসুত ওজিল প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, তাঁর বাঁ পায়ে নিখাদ জাদু আছে। জার্মানির ভার্ডার ব্রেমেন থেকে তাঁকে ছিনিয়ে নিতে দেরি করেনি রিয়াল মাদ্রিদ। প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর বিনিময়ে ওজিলকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে নিয়ে আসে তারা। সেখানে তিন বছর জাদু দেখিয়ে কোপা দেল রে, লা লিগা আর স্প্যানিশ সুপার কাপ জিতে ২০১৩ সালে তৎকালীন রেকর্ড ৪ কোটি ২৪ লাখ পাউন্ডে তিনি যোগ দেন আর্সেনালে।
হামেস রদ্রিগেজ
২০১৪ বিশ্বকাপের কথা উঠলেই সবার আগে চোখের সামনে ভাসে কলম্বিয়ার সেই ছেলেটার কথা। ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতা হামেস রদ্রিগেজ সেবার পুরো বিশ্বকে নিজের প্রেমে ফেলে দিয়েছিলেন। উরুগুয়ের বিপক্ষে বুক দিয়ে বল নামিয়ে তাঁর সেই আইকনিক ভলি গোলটি ফিফার ওয়েবসাইটে ৪০ লাখের বেশি মানুষের ভোটে টুর্নামেন্টের সেরা গোল নির্বাচিত হয় এবং পুসকাস অ্যাওয়ার্ড জেতেন তিনি। এমন রত্নকে রিয়াল মাদ্রিদ হাতছাড়া করবে কেন? টুর্নামেন্ট শেষ হতেই মোনাকো থেকে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ ইউরো খরচ করে তাঁকে উড়িয়ে আনে লস ব্লাঙ্কোসরা।
ভোজিনিয়া
সবশেষ চমকটা তো তুমি জানোই! গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দে যখন তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট পেল, তখন থেকেই ভোজিনিয়া রীতিমতো কাল্ট হিরো। নকআউটে উঠে আর্জেন্টিনাকেও তিনি অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। টুর্নামেন্টের সেরা দলে তো জায়গা পেয়েছেনই, তাঁর নামে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন প্রজাতির সামুদ্রিক স্লাগেরও নামকরণ করে ফেলেছেন! ইনস্টাগ্রামে তাঁর ফলোয়ার ৫০ হাজার থেকে লাফিয়ে ৩ কোটিতে গিয়ে ঠেকেছে!
স্লোভাকিয়া, অ্যাঙ্গোলা, সাইপ্রাস ঘুরে পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের দল চাভেসের এই গোলরক্ষক সব সময় নিজেকে ‘বড় ক্লাবের খেলোয়াড়’ ভাবতেন। আর এবার চিলির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল কোলো-কোলোতে যোগ দিয়ে তিনি সেটা প্রমাণও করে দিলেন।
আরও যাঁরা বিশ্বকাপ খেলেই বিশাল অঙ্কে বিক্রি হয়েছিলেন
বিশ্বকাপের মঞ্চে জাদু দেখিয়ে রাতারাতি দল পাল্টানোর তালিকায় আরও কিছু দারুণ নাম আছে। একনজরে তাঁদের নামগুলো দেখে নিই।
গেয়র্গি হাজি (১৯৯৪): রোমানিয়ার এই খেলোয়াড় বিশ্বকাপ মাতিয়ে ইতালির ব্রেসিয়া থেকে বার্সেলোনায় যোগ দেন প্রায় ৩০ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে।
দেজান স্ট্যানকোভিচ (১৯৯৮): যুগোস্লাভিয়ার হয়ে দারুণ খেলার পর রেড স্টার বেলগ্রেড থেকে তাঁকে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ইউরোতে কিনে নেয় ল্যাজিও।
কার্লোস সালসিদো (২০০৬): মেক্সিকান ডিফেন্ডার গুয়াদালাজারা থেকে পিএসভি আইন্দোভেনে পাড়ি জমান প্রায় ২৫ লাখ ইউরোতে।
নিকোলাস ওটামেন্ডি (২০১০): ভেলেজ সার্সফিল্ড থেকে পোর্তো তাঁকে কিনে নেয় প্রায় ৪০ লাখ ইউরোতে।
এডিনসন কাভানি (২০১০): উরুগুয়ের তারকার পারফরম্যান্স দেখে পালের্মো থেকে প্রথমে লোনে এবং পরে মোট ১ কোটি ৭০ লাখ ইউরোর চুক্তিতে তাঁকে কিনে নেয় নাপোলি।
সামি খেদিরা (২০১০): জার্মানির হয়ে দুর্দান্ত মিডফিল্ড সামলানো এই তারকা স্টুটগার্ট থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যান প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ইউরোতে।
কেইলর নাভাস (২০১৪): কোস্টারিকার রূপকথার নায়ককে লেভান্তে থেকে রিয়াল মাদ্রিদ কিনে নেয় ১ কোটি ইউরোর রিলিজ ক্লজে।
এনার ভ্যালেন্সিয়া (২০১৪): ইকুয়েডরের এই ফরোয়ার্ড পাচুকা থেকে ওয়েস্ট হাম ইউনাইটেডে যোগ দেন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডে।
এনজো ফার্নান্দেজ (২০২২): আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী এই তরুণকে বেনফিকা থেকে চেলসি কিনে নেয় ব্রিটিশ রেকর্ড প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ ইউরোতে!
সূত্র: বিবিসি
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
বিশ্বকাপের টিকিট পেল আফগানিস্তান, বাছাইপর্ব খেলতে হবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে
১১ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:৪৫ AM · প্রথম আলো
আলাদা টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনায় তিন মহাদেশের ফুটবল কর্তারা
১০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:৪৫ PM · প্রথম আলো
