বালু নিয়ে নৈরাজ্য, খুনোখুনি, কর্ণফুলীপাড়ে আতঙ্ক
১২ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৩৫ PM

কর্ণফুলী নদী এখন সিরাজুল ইসলামের ঘর থেকে কয়েক ফুট দূরে। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটার গোডাউন ব্রিজের পাশে ছোট দোকানে চা-বিস্কুট বিক্রি করে সংসার চালান তিনি। বৃষ্টি হলেই তাঁর ভয় বাড়ে। রাতে ঘুম আসে না, যদি ঘুমের মধ্যেই ঘরসহ নদীতে চলে যান।
সিরাজুলের ঘরের পাশেই রেজাউল করিমের বাড়ি। তাঁর ভয় শুধু বসতভিটা নিয়ে নয়, গোডাউন ব্রিজ নিয়েও। তিনি বলেন, সেতুর খুঁটির তলদেশ থেকেও ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হয়েছে। ফলে খুঁটির চারপাশে গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে কর্ণফুলীতে এত বড় ড্রেজার দেখা যায়নি। রাত দুইটার পরও ড্রেজারের শব্দ থামত না। অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ এবং ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধে রাঙ্গুনিয়ায় অন্তত ৭টি খুনসহ ২০টির বেশি খুন-জখম ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১২টি খুন-জখমের ঘটনার সঙ্গে বালুসংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র পেয়েছে প্রথম আলো।
সর্বশেষ গত ১৩ জুন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে বালুর ব্যবসা ও দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে।
বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হতো বলে অভিযোগ করেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিবাদ করলে বালু উত্তোলনকারীরা বলতেন, ‘তোর বাপের নদী? বেশি কথা বললে একদম জবাই করে দেব।’ বিদেশ থেকে ফেরার ১৫ দিনের মধ্যে হুমায়ুন নামের একজনকে কুপিয়ে হত্যার কথাও জানান তিনি। এসব কারণে নদীপাড়ের অধিকাংশ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।
রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী, সরফভাটা, চন্দ্রঘোনা, কদমতলী, ইসলামপুর, দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অবৈধ বালু ব্যবসার একটি বড় চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি প্রশাসনের একটি অংশের যোগসাজশে চক্রটি কর্ণফুলীকেন্দ্রিক এ বালু–বাণিজ্য চালায়।
শুধু রাঙ্গুনিয়া নয়, চট্টগ্রামের মিরসরাই, সাতকানিয়াসহ অন্যান্য এলাকাতেও ইজারার পরিমাণ ও সীমানা না মেনে বালু তোলার অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, মিরসরাইয়ে অবৈধভাবে বালু তুলতে একসঙ্গে প্রায় ১০০টি যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। প্রশাসনের লোকজন নদীর এক পাড়ে পৌঁছানোর আগেই যন্ত্রপাতি অন্য পাড়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। সম্প্রতি সাতকানিয়ায় এক দিনের অভিযানে প্রায় ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সেখানে বালু পরিবহনের জন্য খাল বন্ধ করে রাস্তা তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে রাঙ্গুনিয়ার তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের অনুসারীরা অবৈধ বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তখন মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর ভাই এরশাদ মাহমুদের হাতে। কোন এলাকায় কারা বালু তুলবেন, তা তিনি ঠিক করে দিতেন।
জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, এখন প্রতি ঘনফুট বালুর ইজারামূল্য গড়ে সাড়ে চার টাকার বেশি। আওয়ামী লীগের সময়ে একই বালু ৩০ পয়সাতেও ইজারা দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হাছান মাহমুদদের নিয়ন্ত্রণ ভাঙলেও বালু–বাণিজ্য বন্ধ হয়নি; বরং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির একাধিক পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বালু উত্তোলনকারীদের কেউ কেউ নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। আবার বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের কেউ কেউ এখন এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণেও যুক্ত হয়েছেন।
রাঙ্গুনিয়ার বালুমহাল থেকে প্রতি মাসে ৭২ লাখ টাকা চাঁদা পেতেন চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী। তাঁর সহযোগী আবদুল কাইয়ুম ওরফে ইমনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এ অর্থপ্রবাহের তথ্য পাওয়া যায় বলে নগর পুলিশের একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাঙ্গুনিয়ার বালুমহাল থেকে বালু পরিবহনকারী বিশেষ কিছু বাল্কহেড থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করা হতো। পোমরা এলাকায় প্রতি বাল্কহেড থেকে গড়ে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হতো। চাঁদা না পেয়ে বাল্কহেড জিম্মি করা, চালককে মারধর এবং একটি বাল্কহেড ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করেছে সন্ত্রাসীরা।
বালু পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা চাঁদার টাকা চান্দগাঁওয়ের ইমনের মাধ্যমে ভারতে অবস্থানরত সাজ্জাদের কাছে যেত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কর্ণফুলীর উত্তর পাড়ে রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী, দক্ষিণ পাড়ে বোয়ালখালীর বিভিন্ন এলাকা। এ ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি আন্ত–উপজেলা বালু সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ। তাঁরা জানান, বোয়ালখালীর কয়েকটি চক্রের সঙ্গে রাঙ্গুনিয়ার কিছু রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পরিবহন ব্যবসায়ী যুক্ত। তাঁরা বালু তোলা, মজুত, পরিবহন এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ‘ব্যবস্থাপনার’ কাজ করেন। এক পাড়ে প্রশাসনিক অভিযান শুরু হলে ড্রেজার অন্য পাড়ে সরিয়ে নদীর ওই অংশের সীমানা নিয়ে জটিলতা তৈরি করা হতো।
বেতাগী স্লুইসগেট, নাজিরচর, মির্জাখিল, প্রজেক্ট গেট, সৌদিয়া গেট, সরফভাটার গোডাউন ব্রিজ ও ভূমির খিল এলাকায় বড় আকারে বালু তোলার তথ্য দিয়েছেন বাসিন্দারা। মির্জাখিলের মোহাম্মদ জাহেদ বলেন, বোয়ালখালী অংশ থেকে ড্রেজার আসত। কোনো কোনো রাতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৮টি পর্যন্ত ড্রেজার দেখা যেত। একসঙ্গে ছয়টি বালুবোঝাই বাল্কহেড চলাচল করতেও দেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
গত বছরের ১১ মার্চ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের বালুমহাল ইজারার বিজ্ঞপ্তিতে রাঙ্গুনিয়ার সাতটি বালুমহাল ছিল। এগুলোতে সম্ভাব্য বালুর পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৩৭ ঘনফুট। সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৮৯ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬১ টাকা।
কিন্তু সরকারি হিসাবে নির্ধারিত পরিমাণ ও সীমানার সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার মিল নেই বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। তাঁদের অভিযোগ, উত্তোলন নির্ধারিত বালুমহালে সীমাবদ্ধ ছিল না। নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে যে যেভাবে পেরেছেন, বালু তুলেছেন।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, বালুকে কেন্দ্র করে রাঙ্গুনিয়ায় খুনসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। বালুমহাল ইজারা দেওয়া হলেও শর্ত মানা হচ্ছে না। এগুলোর তদারকিতেও ঘাটতি রয়েছে। এ জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিন কর্ণফুলীর দুই পাড়ের বহু স্থানে বালুর স্তূপ দেখা গেছে। গোডাউন ব্রিজের পূর্ব পাশে ভূমির খিল এলাকায় নদীর পাড়ে এখনো বিপুল পরিমাণ বালু পড়ে আছে। নদীতে একটি ড্রেজারও দেখা যায়, যদিও সেটি চালু ছিল না।
স্থানীয় বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, পাড় ঘেঁষে বালু তোলায় ভাঙন ঠেকাতে বসানো কংক্রিটের ব্লকের নিচ থেকে মাটি ও বালু সরে যাচ্ছে। অনেক ব্লক দেবে নদীতে পড়ে গেছে। অনেক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ড্রেজারের শব্দে আশপাশের বাসিন্দারা রাতে ঘুমাতে পারতেন না।
এখন অবশ্য সেখানে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। তবে নদীভাঙন থামেনি। স্থানীয় বাসিন্দা খোরশেদ আলমের ভিটার প্রায় ১০ ফুট বর্ষা শুরুর পর নদীতে বিলীন হয়েছে। নদীপাড় জামে মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হোসাইন জানান, সাত বছর আগে মসজিদ থেকে নদীর দূরত্ব ছিল ৩০ থেকে ৩৫ ফুট। নদী এখন এত কাছে এসেছে যে মসজিদটি যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। তীরের কাছে ড্রেজারে তৈরি গভীর খাদ থাকায় মানুষ এখন নদীতে নামতেও ভয় পান।
ভূমির খিলের কাঠমিস্ত্রি মো. আলীর বসতভিটা গত বছর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তিনি এখন ভাড়া বাসায় থাকেন। ঘর হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন মো. সাগর। শিলক, কদমতলী, মরিয়ম নগর ও কোদালার কর্ণফুলীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারাও বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় আছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাঙ্গুনিয়া-রাঙামাটি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, রাতের বেলা চুরি করে পাড় ঘেঁষে ড্রেজারে বালু তোলায় গোডাউন, সরফভাটাসহ কয়েকটি স্থানে নদীর তীর ভাঙছে। ভাঙনকবলিত স্থানগুলোর জরিপ শেষে ভাঙনরোধে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হবে।
কর্ণফুলীর তীরবর্তী বেতাগীর প্রজেক্ট গেট এলাকায় গিয়ে বালুর বিশাল স্তূপ দেখা যায়। স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, জায়গাটি ১৯৮৫ সালে এতিমখানা ও সমাজসেবামূলক প্রকল্প গড়ার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। কোনো কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় পরিত্যক্ত জায়গাটি পরে বালু মজুতের কাজে ব্যবহৃত হয়। আশপাশের কৃষিজমিতেও বালু রাখা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কৃষক বলেন, নিষেধ করার পরও তাঁর জমিতে বালু রাখা হয়। গত এপ্রিল থেকে সেখানে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও তাঁর প্রায় ২০ শতক জমি বালুর নিচে পড়ে এখনো চাষাবাদের অনুপযোগী। বালু পরিবহনের জন্য প্রজেক্ট গেট এলাকার একটি পাহাড়ের অংশ কেটে পথ তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইদ্রিস আলম বলেন, কোনো কোনো স্থানে বালুর স্তূপ এত উঁচু হয়েছিল যে তা বিদ্যুতের তার ছুঁয়ে যায়। ছয় বছরের এক শিশু সেই স্তূপে খেলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। ভয়ে পরিবারটি মামলা করেনি।
বালু মজুতের স্থান ও নদীর ঘাট পাহারা দিতে অস্ত্রধারী লোক রাখা হতো বলে অভিযোগ স্থানীয় লোকজনের। কেউ ছবি বা ভিডিও করছেন কি না, তাঁরা নজরদারি করতেন। এক যুবক রাতে নদীতে মাছ ধরতে গেলে মুঠোফোনের পর্দায় আলো জ্বলে ওঠায় তাঁকে মারধর করে অস্ত্র তাক করা হয়। বালু উত্তোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সাংবাদিকও হামলার শিকার হয়েছেন।
গত জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীসহ সবাই কর্ণফুলী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নির্বাচিত সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী গত এপ্রিলে রাঙ্গুনিয়ায় নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের ঘোষণা দেন। চলতি বছরে রাঙ্গুনিয়ার বালুমহালগুলোর নতুন ইজারাও বন্ধ রেখেছে জেলা প্রশাসন। গত প্রায় দুই মাস দৃশ্যমানভাবে বড় আকারে বালু তোলা বন্ধ থাকলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।
উত্তোলনের সময় নদীর পাড় ও কৃষিজমিতে মজুত করা বিপুল পরিমাণ বালু এখনো রয়ে গেছে। স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, পুরোনো চক্রের লোকজন রাতে সেই বালু ট্রাকে তুলে বিক্রি করছেন। বালুবাহী বড় ট্রাক চলাচলের ফলে স্থানীয় সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। অনেক কৃষিজমি এখনো চাষাবাদের অনুপযোগী। সরকারি ইজারা, উত্তোলিত বালু হস্তান্তর, সরকারি কার্যাদেশ, চাঁদাবাজি ও পরিবহন চক্র—সবকিছুই রাঙ্গুনিয়ার বালু–বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেতাগী এলাকায় বালু উত্তোলনে উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য মো. জাহাঙ্গীর, উত্তর জেলা যুবদলের সদস্য নিহত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও মো. সালাহউদ্দিনের নাম বেশি এসেছে।
এ ছাড়া সরফভাটায় উপজেলা বিএনপির সদস্য মো. রফিক, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সদস্যসচিব মহিবউল্লাহ ও আবুধাবি বিএনপির সভাপতি ইসমাইল তালুকদার; চন্দ্রঘোনা-কদমতলী এলাকায় উপজেলা বিএনপির সদস্য ইউসুফ সিকদার, উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব এস এম লোকমান, কদমতলী ১১ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক দলের সহসভাপতি মো. ইব্রাহিম ও তাঁর ভাই মাহবুবের নাম এসেছে।
তবে সালাহউদ্দিন প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, সরকারিভাবে যেসব বালু বিক্রির অনুমতি পেয়েছেন, সেগুলোই করেছেন। এর বাইরে এক মুঠো বালুও তোলা হয়নি। উল্টো ব্যবসার করতে গিয়ে বিএনপিসহ এলাকার বিভিন্ন লোকজনকে চাঁদা দিতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিনের মতো অভিযুক্ত অন্যরাও বালু নিয়ে তৈরি হওয়া নৈরাজ্যে নিজেদের দায় অস্বীকার করেন। উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য মো. জাহাঙ্গীর দাবি করেন বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী খননের দরপত্র অনুযায়ী বেতাগীতে বালু তোলা হয়েছে। অতিরিক্ত বালু তোলা হয়নি।
ইউসুফ সিকদার, এস এম লোকমান ও মো. ইব্রাহিমও অবৈধ বালু ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির বর্তমানে কোনো কমিটি নেই। বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে বালু দখলে জড়িত বেশির ভাগের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সময়ের সুবিধাভোগীরা বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে এসব অপকর্ম করছেন। দল তাঁদের বিষয়েও সতর্ক রয়েছে।
গত জুনে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রাঙ্গুনিয়ার বালুমহাল থেকে ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। অথচ বালু উত্তোলনে সৃষ্ট নদীভাঙন ঠেকাতে ব্লক স্থাপন ও তীর রক্ষায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। বালু উত্তোলনকে তিনি মাফিয়া চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসা হিসেবে উল্লেখ করে এর সঙ্গে রাঙ্গুনিয়ার সহিংসতা ও মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যার সম্পর্কের কথাও বলেন।
প্রথম আলোকে হুম্মাম কাদের বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করব। আমি সেটি করেছি। এরপরও কেউ বালু তুললে, সে আমার দলের হলেও বিন্দুমাত্র ছাড় নেই। বালুর কারণে রাঙ্গুনিয়ায় নানা ঘটনা ঘটছে। বালু তোলা বন্ধ, সব শান্ত।’
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা প্রথম আলোকে বলেন, চলতি বছরে রাঙ্গুনিয়ার সব বালুমহালের ইজারা বন্ধ করা হয়েছে। তবে অন্যান্য স্থানে রাতের অন্ধকারে অবৈধভাবে বালু তোলা পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন। প্রশাসনের লোকজন অভিযানে পৌঁছানোর আগেই তথ্য পেয়ে ড্রেজার ও যন্ত্রপাতি নদীর অন্য পাড়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। সীমিত জনবল নিয়ে সব জায়গায় একসঙ্গে নজরদারি সম্ভব হয় না। বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন ও তীর রক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের কথাও স্বীকার করেন তিনি।
প্রশাসনের কারও সঙ্গে বালু উত্তোলনকারীদের যোগসাজশের সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাননি বলে জানান জেলা প্রশাসক। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগ এলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন—সরকারি সংস্থার কোনো অংশের সহযোগিতা বা নীরবতা ছাড়া বালুভর্তি এত ট্রাক ও বাল্কহেড নদীঘাট, সড়ক, বাজার, সেতু ও সরকারি দপ্তরের সামনে দিয়ে নিয়মিত চলাচল করে কীভাবে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, এত বড় পরিসরে বালু উত্তোলন সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজান্তে চলতে পারে না। বছরের পর বছর এসব কর্মকাণ্ড চললেও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াই প্রমাণ করে, রাজনৈতিক প্রভাবশালী, বালু ব্যবসায়ী ও তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রশাসনের ব্যক্তিদের যোগসাজশ রয়েছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শুধু অভিযান চালিয়ে কর্ণফুলী এবং এই নদীর পাড়ের মানুষের আবাসস্থল রক্ষা করা যাবে না।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
সাভারে স্কচটেপে মোড়ানো প্রেশার কুকার, বোমা সন্দেহে ঘিরে রেখেছে পুলিশ
১২ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৩১ PM · প্রথম আলো
নেত্রকোনায় লোকালয় থেকে বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর উদ্ধার
১১ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৪০ PM · প্রথম আলো
