শাহজাদপুর সংবাদ

বশীর আহমেদ: সব্যসাচী চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৪৯ AM

বশীর আহমেদ: সব্যসাচী চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়

হকি, ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকস—চার খেলাতেই মাঠে ছিলেন বশীর আহমেদ। শুধু খেলেননি, চার খেলাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৯৫৯-৬০ মৌসুমে ফুটবলে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্লু’ সম্মাননা। পরে খেলেছেন পাকিস্তান জাতীয় হকি দলে। ১৯৮০ সালে পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিবও ছিলেন।

‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক নিয়মিত সাক্ষাৎকারের অংশ হিসেবে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম তাঁর। শোনা হলো তাঁর গল্প।

১৯৪১ সালে পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে বশীর আহমেদের জন্ম। তাঁর খেলোয়াড় হয়ে ওঠার জায়গা মাহুতটুলী ও আরমানিটোলা স্কুল। ছোটবেলা থেকেই স্কুলের মাঠে তাঁর দিন কাটত। ভোরে মাঠে গিয়ে ১৫-২০ চক্কর দৌড়াতেন। অ্যাথলেটিকসের পাশাপাশি হকি, ফুটবল ও ক্রিকেট খেলতেন।

আরমানিটোলা স্কুলের চারটি হাউসের মধ্যে তিনি ছিলেন ওয়েস্ট হাউসে। চার হাউসের প্রতিযোগিতাই তাঁকে প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করে দেয়। তাঁর কথায়, ‘কম্পিটিশন করার যে একটা মোহ কিংবা কম্পিটিশন করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে একটা জেদ, ওটা ওইখান থেকেই তৈরি হয়েছে।’

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই হকিতে তাঁর ক্লাব পর্যায়ের শুরু। ১৯৫৭ সালে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে হকি খেলেন। তার আগে ১৯৫৬ সালের দিকে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়েও হকিতে মাঠে নেমেছিলেন।

অ্যাথলেটিকসেও তিনি সাফল্য পান স্কুলজীবনেই। হাই জাম্প, লং জাম্প, ডিসকাস থ্রো ও শটপুট—সবই করতেন। এক আন্তস্কুল প্রতিযোগিতায় কয়েকটি ইভেন্টে দ্বিতীয় হয়েও মোট পয়েন্টে চ্যাম্পিয়ন হন। পরে অ্যাথলেটিকস ছেড়ে দিলেও একবার মোহামেডানের রিলে দলে নেমে দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে সাহায্য করেন। দলটি রেকর্ডও করেছিল।

ফুটবলে তাঁর বড় টুর্নামেন্ট ছিল আগা খান গোল্ড কাপ। ১৯৫৯ সালে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে তিনি ভিক্টোরিয়ার খেলোয়াড় হয়েও মোহামেডানের হয়ে খেলেন। মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৬৭ সালে ফেনীতে জগন্নাথ কলেজের হয়ে খেলতে গিয়ে তাঁর পা ভেঙে যায়। এরপর পেশাদার ফুটবল আর চালিয়ে যেতে পারেননি।

হকিতে অবশ্য তাঁর সাফল্য আরও বড়। ১৯৬২ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে পাকিস্তানের হয়ে খেলেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি হকিতে অ্যাটলিস্ট ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন টিমে খেলেছি।’ সে সময় পাকিস্তান ছিল বিশ্বসেরা হকি দলগুলোর একটি।

গোল করাতেও তাঁর রেকর্ড ছিল। এক ম্যাচে করেছিলেন ‘ট্রিপল হ্যাটট্রিক’। ন্যাশনাল ব্যাংকের হয়ে একটি ম্যাচে ১৩ গোল করার কথাও বলেছেন তিনি। গোলের জায়গা সম্পর্কে তাঁর নিজের ভাষায়, ‘আমি যেকোনো জায়গা থেকে মারলে অ্যাটলিস্ট পোস্টে যাবে। পোস্টে আমার এমন অবস্থা হয়েছিল যে মারলেই একটা পোস্টে যাবেই। এটা গোল হোক কিংবা না হোক।’

ক্রিকেটও খেলেছেন দীর্ঘদিন। ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন হকির পাশাপাশি। খেলাধুলার প্রতি তাঁর আগ্রহের কারণেই একই সময়ে একাধিক খেলা চালিয়ে যেতেন। বশীর বলেন, ‘সব খেলাই উপভোগ করতাম, সব খেলাতেই ভালো করার প্রবল ইচ্ছে হতো।’

১৯৫৯ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে চাকরি শুরু করেন। পরে প্রতিষ্ঠানটি সোনালী ব্যাংক হয়। চাকরি থেকে অবসর নেন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে। খেলাধুলার সঙ্গে চাকরিও চালিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বর্তমান অবস্থার কথাও বলেছেন বশীর আহমেদ। তাঁর মতে, শুধু টাকা দিয়ে ভালো খেলোয়াড় তৈরি হয় না। দরকার প্রতিভা, প্রশিক্ষণ, ভালো কোচ ও সংগঠক। উদাহরণ হিসেবে তিনি পেলে, ম্যারাডোনা ও মেসির কথা বলেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব আল হাসান ও মুস্তাফিজুর রহমানের মতো প্রতিভার কথাও উল্লেখ করলেন তিনি।

শেষে যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা আছে কি না, বশীর আহমেদের উত্তর, ‘আশাই তো মানুষের জীবন। আশা আছে বলেই তো আমরা আছি। অতীত আছে বলেই তো ভবিষ্যৎ।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ