শাহজাদপুর সংবাদ

পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে এমবিএ ও ইএমবিএ ডিগ্রি যেভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে

১১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১০:০০ AM

পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে এমবিএ ও ইএমবিএ ডিগ্রি যেভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন খাতে পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনিস্টিটিউট ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ থেকে মাস্টার্স অব বিজনেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) ও এক্সিকিউটিভ এমবিএ (ইএমিবিএ) ডিগ্রির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং নিত্যনতুন বিজনেস মডেলের উদ্ভব প্রচলিত ব্যবসা পরিচালনাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আজকের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রে কেবল গতানুগতিক অভিজ্ঞতা বা একটি সাধারণ গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি দিয়ে ক্যারিয়ারের শীর্ষপর্যায়ে অবস্থান ধরে রাখা কঠিন। আর ঠিক এ কারণেই বাংলাদেশে পেশাজীবীদের মধ্যেও এমবিএ ও ইএমবিএ প্রোগ্রাম বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যা তাদের প্রয়োগিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও ব্যবসায় সমসাময়িক জটিল সমস্যা সমাধানে নিজেদের তৈরি করার এক সুবর্ণ সুযোগ করে দিচ্ছে।

ব্যবসায় যেমন ক্রমশ আধুনিকায়ন হচ্ছে, তেমনি দেশীয় ও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে, যার ফলে দেশের প্রসিদ্ধ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে সুদক্ষ ও আধুনিক জ্ঞানসমৃদ্ধ ম্যানেজারের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইএমবিএ প্রোগ্রামের সব ক্লাস সন্ধ্যার থেকে শুরু হয়, যাতে চাকরির পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রম খুব সাবলীলভাবে চালানো যায়, যার ফলে এই ডিগ্রি করপোরেট পেশাজীবীদের কাছে সমাদৃত হচ্ছে বেশি। চাকরি ছেড়ে এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে এ ডিগ্রি ধারণ করা বেশির ভাগ করপোরেট প্রফেশনালদের কাছে যুক্তিযুক্ত নয়। ই-এমবিএ প্রোগ্রাম তাই চাকরিজীবীদের জন্য এক অসামান্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যার মাধ্যমে প্রফেশনাল জীবন ঠিকঠাক বজায় রেখে একাডেমিক যোগ্যতা বৃদ্ধি করে ক্যারিয়ারে ক্রমবর্ধমান উন্নতির পথ তৈরি হচ্ছে।

একসময় সাধারণ এমবিএ প্রোগ্রাম ছিল করপোরেট ক্যারিয়ারে পদোন্নতির মূল চাবিকাঠি। সেখানে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট এবং মৌলিক ব্যবসায়িক কৌশল শেখানো হতো সামগ্রিকভাবে। কিন্তু এখন করপোরেট বিশ্ব বেশ জটিল হয়ে পড়েছে। শুধু সাধারণ ব্যবস্থাপনার জ্ঞানে জটিল করপোরেট সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞানের বিশেষ দরকার দেখা দিচ্ছে। ই-এমবিএ প্রোগ্রামের কোর্সগুলো দেশের ও বহির্বিশ্বের অত্যাধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক পরিবেশের সঙ্গে মোকাবিলা করার প্রয়োজনীয় কৌশলগত জ্ঞান ও বহুমাত্রিক জটিল সমস্যা নিরসনে বৈচিত্র্যপূর্ণ দক্ষতা প্রদান করে। দেশীয় বা বিদেশি শিল্প ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বস্থানীয় পদ অর্জন করে বিজনেস লিডার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে ই-এমবিএ প্রোগ্রামের বিকল্প নেই। বর্তমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ই-এমবিএ প্রোগ্রামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিজনেস অ্যানালিটিকস, অ্যাগ্রি-বিজনেস ব্যবস্থাপনা, ফিনটেক, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং ও কয়ান্টেটেটিভ বিজনেস অ্যানালিসিসের মতো অপরিহার্য বিষয় অভিজ্ঞ শিক্ষক দ্বারা শেখানো হচ্ছে। ক্লাসরুমভিত্তিক শিক্ষা দান ছাড়াও করপোরেট মতবিনিময় সেশন, রিয়েল-টাইম কেস স্টাডি, গেস্ট লেকচার, করপোরেট ভিজিট, সিমুলেশন ও ইন্ডাস্ট্রি-লিড প্রজেক্ট এবং সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমধর্মী জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা লাভের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রের করপোরেট প্রফেশনালদের নির্ভরযোগ্য পেশাদার নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।

ক্লাসরুম শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশল শেখে, যা আধুনিক করপোরেট চালচিত্রে অত্যন্ত কার্যকর। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস, স্ট্র্যাটেজিক মার্কেটিং, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের মৌলিক ধারণাগুলোর পাশাপাশি বাস্তবধর্মী ডেটা বিশ্লেষণ করে ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমানোর উপায় শেখানো হয়। ক্লাসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কেস স্টাডি সমাধানের মাধ্যমে উদীয়মান বাজারের অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কোম্পানির সম্পদ সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রায়োগিক দিকগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তা ছাড়া শ্রেণিকক্ষের গ্রুপ ডিসকাশন ও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে স্ট্র্যাটেজিক লিডারশিপ ও নেগোসিয়েশন স্কিল অর্জিত হয়। কীভাবে একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম পরিচালনা করতে হয় এবং সংকটকালে কৌশলগত পরিবর্তন বা ‘পিভট’ করে ব্যবসাকে লাভজনক রাখা যায়, তা ক্লাসরুম সিমুলেশনের মাধ্যমে হাতে-কলমে শেখা সম্ভব হয়। ব্যবসায়িক নীতিশাস্ত্র, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরিতেও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এমবিএ ডিগ্রি ধারণকারী প্রফেশনালরা ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে ফলপ্রদ ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ব্যবসার উন্নতি সুনিশ্চিত করে। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মক্ষমতা লক্ষণীয় মাত্রায় বৃদ্ধি হওয়ার মাধ্যমে দেশের ও বিদেশের বাজারে শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে। আবার এমবিএ ও ইএমবিএ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে করপোরেট প্রফেশনালদের বুদ্ধিদিপ্তি বিকশিত হয়, যা তাদের মেধাকে পরিপূর্ণভাবে সঠিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নির্ধারণে সাহায্য করে। করপোরেট প্রফেশনালরা প্রতিনিয়ত নতুন ও আধুনিক জ্ঞান আরোহণের চর্চা শুরু করে এমনকি ই-এমবিএ প্রোগ্রাম সম্পন্ন হওয়ার পরও। এ চর্চার কারণে নতুন কোনো দুর্বোধ্য সমস্যা দেখা দিলে তার সমাধান নিমিষেই বের করতে সক্ষম হয়।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হার্ভার্ড, ইনসিয়াড কিংবা আইআইএমের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান এখন প্রচলিত ডিগ্রির পাশাপাশি টেইলর-মেড ই-এমবিএ প্রোগ্রাম গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এমবিএ ও ইএমবিএ প্রোগ্রাম চালুর মাধ্যমে পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন করছে। পেশাজীবীরা বছরে দুটি বা তিনটি সেশনে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এ প্রোগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এ ছাড়া উইকেন্ড বা হাইব্রিড মডেলের মাধ্যমে কর্মজীবীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়সূচি হাতে পাচ্ছেন। বহুনির্বাচনী ও লিখিত প্রশ্নের মাধ্যমে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি, অঙ্ক, যুক্তিবিদ্যা, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও সাধারণ জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়ে থাকে। দেশের অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি ও গ্রহণযোগ্য রেজাল্ট থাকলেই এ প্রোগ্রামে ভর্তি হতে পারেন। এ প্রোগ্রামটি সম্পন্ন করতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুযায়ী পরীক্ষার সেশন, নিয়ম, বিষয় ও ভর্তির যোগ্যতা বিভিন্ন হতে পারে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ