শাহজাদপুর সংবাদ

পছন্দের দুই দেহরক্ষীর ৩০ গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ইন্দিরা

১ নভেম্বর, ২০২৬ এ ৮:০০ AM

পছন্দের দুই দেহরক্ষীর ৩০ গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ইন্দিরা

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর পছন্দের শিখ দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। ‘অপারেশন ব্লু স্টার’-এর জের ধরে এই ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ড ঘটে, যা ভারতের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

দিনটি আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই ছিল। সকাল থেকে চারপাশ রোদ-ঝলমলে। অন্যান্য কর্মব্যস্ত দিনের মতো আজও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সাড়ে সাতটার মধ্যে তিনি তৈরি হয়ে যান। আলমারি থেকে বেছে নেন কালো পাড়ের গেরুয়া রঙের একটি শাড়ি। দিনের শুরুতেই বিদেশি এক তথ্যচিত্র নির্মাতার সঙ্গে শুটিং আছে। তাই, হয়তো এই শাড়িটি বেছে নিয়েছিলেন।

শাড়ি পরে তৈরি হয়ে আসেন নাশতার টেবিলে। নাশতার পর মেকআপম্যান তাঁর মুখে সামান্য পাউডার ও ব্লাশার লাগিয়ে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যে হাজির হন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক কে পি মাথুর, নিয়মমাফিক তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন।

দিনটি ছিল ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দিনের প্রথম সাক্ষাৎসূচি (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) দেওয়া ছিল পিটার উস্তিনভকে। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করছিলেন।

৯টা ১০ মিনিটে ইন্দিরা বাসভবনের বাইরে পা রাখেন। কালো রঙের ছাতা নিয়ে তাঁর পাশে হাঁটছিলেন সিপাহি নারায়ণ সিং। প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছিলেন তাঁর দপ্তরের দিকে।

কিছুটা পেছনে ছিলেন ইন্দিরার ব্যক্তিগত সচিব আর কে ধাওয়ান। তাঁর পেছনে ব্যক্তিগত পরিচারক নাথু রাম। আর সবার পেছনে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা রামেশ্বর দয়াল।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের পাশেই আকবর রোডে তাঁর দপ্তর। এই দুই ভবনের মধ্যে যাতায়াতের একটা সংযোগ পথ ছিল। সেই পথের ফটকের সামনে গিয়ে ইন্দিরা তাঁর ব্যক্তিগত সচিব আর কে ধাওয়ানের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ধাওয়ানকে নানা নির্দেশনা দিচ্ছিলেন ইন্দিরা। হঠাৎ গুলির শব্দ। একটি নয়, দুটি নয়, পরপর তিনটি।

সেখানে থাকা লোকজন বিস্ফারিত চোখে প্রধানমন্ত্রীকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখেন, বুঝতে পারছিলেন না ঠিক কী ঘটছে। কয়েক সেকেন্ড পর একটি চিত্কার শোনা যায়, ‘গুলি চালাও…।’ কাছেই গর্জে ওঠে একটি সাবমেশিনগান।

সেদিন নিজের পছন্দের দুই দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। দেশটির রাজনীতির ইতিহাসে সূচনা হয় এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের।

রাজনীতিতে আপসহীন ও দৃঢ় মানসিকতার জন্য ইন্দিরা গান্ধী ‘ভারতের লৌহমানবী’ হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর নেতৃত্ব, বিচক্ষণতা, সাহসিকতার নাম–যশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ছড়িয়ে পড়েছিল।

তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৪ সালের মাঝামাঝি ইন্দিরা ‘কঠিন’ এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওই সিদ্ধান্তের মূল্য তাঁকে জীবন দিয়ে শোধ করতে হয়েছিল। তাঁর ওই কঠিন সিদ্ধান্ত ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ নামে পরিচিত।

শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উৎখাতে ১৯৮৪ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা শিখদের পবিত্র তীর্থস্থান পাঞ্জাবের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই সামরিক অভিযানই ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ নামে পরিচিত।

রক্তক্ষয়ী ওই অভিযানের পর ইন্দিরা ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ভারতে ও বিদেশে শিখদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়। অনেকে এ অভিযানকে শিখ ধর্মের ওপর আক্রমণ বলে চিহ্নিত করেন। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অনেক শিখ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন।

স্বর্ণমন্দিরে অভিযানের পর ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার ওপর হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। তারা প্রধানমন্ত্রীর শিখ নিরাপত্তাকর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশও করেছিল।

গোয়েন্দাদের সুপারিশ–সংবলিত ফাইল যখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল, তখন তিনি নিজে সেই সুপারিশ নাকচ করে দেন। সুপারিশের নথি ইন্দিরার টেবিলে গেলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। তিনি সুপারিশের ফাইলে তাঁর নোট লিখেছিলেন, ‘আমরা কি ধর্মনিরপেক্ষ নই?’

নিজের চতুর্থ মেয়াদের শুরুতেই ভারতের রাজনৈতিক অখণ্ডতার প্রশ্নে একের পর এক সংকটে পড়ে ইন্দিরা গান্ধী সরকার। বেশ কয়েকটি রাজ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন দাবি করে।

অন্যদিকে পাঞ্জাবের শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ‘খালিস্তান’ নামে পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে লড়াই শুরু করে দেয়। নিয়মিত সংঘাত–সহিংসতার ঘটনা ঘটছিল।

রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে পাঞ্জাবের শিখ নেতা জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালেকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু এই যোগসূত্র একসময় বুমেরাং হয়। ভিন্দ্রানওয়ালে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে চলে যান। তিনি খালিস্তানপন্থী আন্দোলনে নাম লেখান।

১৯৮২ সালে ভিন্দ্রানওয়ালে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে শিখদের পবিত্র তীর্থস্থান পাঞ্জাবের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সে ঘাঁটি গাড়েন। অস্ত্রশস্ত্রসহ সেখানে তিনি গড়ে তোলেন শক্ত ঘাঁটি। উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে।

কেন্দ্রীয় সরকার প্রথম দিকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৮৪ সালের জুনে স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন ইন্দিরা।

‘অপারেশন ব্লু স্টার’ নামের রক্তক্ষয়ী এই সামরিক অভিযানের মাধ্যমে স্বর্ণমন্দির থেকে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উৎখাত করা হয়।

সরকারি হিসাবে, এ অভিযানে ৮৩ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। আহত হন প্রায় আড়াই শ সেনা। অন্যদিকে ৪৯২ জন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও বেসামরিক ব্যক্তি এ অভিযানে নিহত হন।

যদিও অন্যদের হিসাব বলছে, হতাহতের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া অভিযানে স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের বড় ধরনের ক্ষতি হয়।

স্বর্ণমন্দিরে অভিযানের পর থেকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রধানমন্ত্রীর ওপর প্রাণঘাতী হামলার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিল। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার পাশাপাশি তাঁর দেহরক্ষীর তালিকা থেকে শিখ দেহরক্ষীদের সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছিল।

কিন্তু ইন্দিরা নিজে শিখ দেহরক্ষীদের পছন্দ করতেন। তাই, তিনি গোয়েন্দা সংস্থার সুপারিশ আমলে নেননি। যদিও তিনি নিজেও খুব সম্ভবত তাঁর ওপর হামলার ঝুঁকির বিষয়টির কতটা গুরুতর, তা আঁচ করতে পেরেছিলেন।

১৯৮৪ সালের ৩০ অক্টোবর, দুই দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হওয়ার মাত্র এক দিন আগে ইন্দিরা নিজের প্রাণহানির ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছিলেন।

৩০ অক্টোবর ওডিশার রাজধানী ভুবনেশ্বরে একটি সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন ইন্দিরা। ভাষণটি যথারীতি লিখেছিলেন তাঁর গণমাধ্যম উপদেষ্টা এইচ ওয়াই শারদা প্রসাদ। ভাষণ দিতে দিতে হঠাৎ স্ক্রিপ্ট থেকে সরে যান ইন্দিরা। তিনি তাঁর মতো করে বলতে থাকেন।

ইন্দিরা সেদিন বলেছিলেন, ‘আমি আজ এখানে রয়েছি, কাল না–ও থাকতে পারি। আমি থাকলাম কি না, সেটা নিয়ে আমি ভাবি না; অনেক দিন বেঁচেছি। আমি গর্বিত যে আমি পুরো জীবনটাই দেশের মানুষের সেবায় কাজে লাগাতে পেরেছি। আর শেষনিশ্বাস পর্যন্ত আমি সেটাই করে যাব। আর যেদিন মরে যাব, আমার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা ভারতকে আরও মজবুত করার কাজে লাগবে।’

এই ভাষণই শেষ পর্যন্ত ইন্দিরার জীবনের শেষ ভাষণে পরিণত হয়। ভাষণ শেষে তিনি রাজ্যপালের বাসভবনে যান। তখন রাজ্যপাল বিশ্বম্ভরনাথ পান্ডে তাঁকে বলেছিলেন, ‘একটা রক্তাক্ত মৃত্যুর কথা বলে আপনি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেন।’

জবাবে ইন্দিরা বলেছিলেন, ‘আমি যা বলেছি, তা নিজের মনের কথা। এটা আমি বিশ্বাস করি।’

ওডিশা থেকে সেদিন রাতেই নয়াদিল্লিতে ফেরেন ইন্দিরা।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের পাশেই আকবর রোডে ইন্দিরার দপ্তর ছিল। এই দুই ভবনের মধ্যে যাতায়াতের পথটিতে একটি ফটক ছিল। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর সকালে নিজের বাসভবন থেকে কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা। শিখ নিরাপত্তাকর্মী বিয়ন্ত সিং যখন তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালান, সে সময় ইন্দিরা তাঁর ব্যক্তিগত সচিব আর কে ধাওয়ানের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ধাওয়ানকে নানা নির্দেশনা দিচ্ছিলেন ইন্দিরা।

দেহরক্ষী বিয়ন্ত সিং ফটকের পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন। তিনি হঠাৎ তাঁর পয়েন্ট ৩৮ রিভলবার বের করে প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে গুলি চালান।

বিয়ন্তের ছোড়া প্রথম গুলিটি ইন্দিরার পেটে লাগে। গুলি থেকে বাঁচতে ইন্দিরা তাঁর ডান হাত ওপরে তুলেছিলেন। তখন কাছ থেকে পরপর আরও দুটি গুলি ছোড়েন বিয়ন্ত। এই দুটি গুলি ইন্দিরার বুকে ও কোমরে লাগে।

মাত্র পাঁচ ফুট দূরেই একটি অটোমেটিক সাবমেশিনগান নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আরেক শিখ নিরাপত্তাকর্মী সতবন্ত সিং। গুলিতে ইন্দিরার লুটিয়ে পড়া দেখে তিনি হয়তো খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

বিয়ন্ত সিং নিজে গুলি চালানোর পর চিৎকার করে সতবন্তকে বলেন, ‘গুলি চালাও।’

গর্জে ওঠে সতবন্তের অটোমেটিক সাবমেশিনগান। সেটিতে থাকা প্রায় ২৮ থেকে ৩০টি গুলি বৃষ্টির মতো প্রধানমন্ত্রীর দিকে ছুটে যায়।

অন্য নিরাপত্তাকর্মীরা এ ঘটনায় এতটাই হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন যে তাঁরা কার্যত কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ পাননি।

বিয়ন্ত ও সতবন্ত নিজেদের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দেন। বিয়ন্ত বলেন, ‘আমাদের যা করার ছিল, সেটা করেছি। এবার আপনাদের যা করার করুন।’

গুলিতে ঝাঁঝরা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা মাটিতে পড়ে ছিলেন। প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখান সিপাহি নারায়ণ সিং, তিনি ইন্দিরার মাথার ওপর ছাতা ধরে ছিলেন। ছাতা ছুড়ে ফেলে তিনি সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন। গুলির শব্দ শুনে ইন্দো–তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি) ও অন্য নিরাপত্তারক্ষীরা ছুটে আসেন।

গোলমালের শব্দ শুনে ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ ও রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী বাইরে ছুটে বেরিয়ে আসেন। তাঁর পরনে তখনো ঘরের পোশাক। ততক্ষণে রক্তাক্ত ইন্দিরাকে মাটি থেকে তুলে একটি সাদা রঙের অ্যাম্বাসেডর গাড়ির দিকে ছুটছেন নিরাপত্তারক্ষীরা। সোনিয়া পেছন পেছন দৌড়ে যেতে যেতে ‘মাম্মি, মাম্মি’ বলে চিৎকার করছিলেন।

গাড়ির পেছনের আসনে ইন্দিরাকে শুইয়ে দেওয়া হয়, রক্তে ভেসে যাচ্ছিল তাঁর দেহ। গাড়িতে উঠে শাশুড়ির মাথা কোলে তুলে নেন সোনিয়া। সাদা অ্যাম্বাসেডর ছোটে তিন কিলোমিটার দূরে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এআইআইএমএস) হাসপাতালের দিকে।

সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে সব সময় একটি অ্যাম্বুলেন্স রেডি থাকে। কিন্তু সেদিন সেটি ছিল না।

ঝড়ের বেগে কয়েক মিনিটের মধ্যে গাড়ি পৌঁছে যায় হাসপাতালে। হতবিহ্বল চিকিৎসকেরাও বুঝতে পারছিলেন না, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে।

এদিকে ঘটনাস্থলে থাকা অন্য নিরাপত্তারক্ষীরা দুই আততায়ীকে গুলি করে ধরাশায়ী করেন। বিয়ন্ত সিং ঘটনাস্থলেই মারা যান। অন্য আততায়ী সতবন্ত সিংকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁর বিচার হয়। ১৯৮৬ সালে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং ১৯৮৯ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ইন্দিরা গান্ধীকে যে তাঁর নিজের পছন্দের দেহরক্ষীরাই হত্যা করবে, এমনটা কেউ কল্পনাও করেননি।

নিহত হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে বিয়ন্ত সিংকে দেখিয়ে ইন্দিরা বেশ গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমার চারপাশে যদি তাঁর মতো শিখরা থাকে, তাহলে আমাকে কোনো কিছু নিয়ে ভয় পেতে হবে না।’

১৯৬৬ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর ইন্দিরাকে কংগ্রেসের নেতা ঘোষণা করা হয়। আর সেই সুবাদে তিনি হন প্রধানমন্ত্রী। একজন নারীর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত টাইম সাময়িকী তখন তাঁকে নিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল।

১৯৬৬ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৭ সালের মার্চ পর্যন্ত একটানা তিন মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা। এই সময়কালের মধ্যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতির মামলায় ১৯৭৫ সালের ১২ জুন ইন্দিরাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট। এ ঘটনার জেরে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন ইন্দিরার পরামর্শে ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি।

ইন্দিরা দাবি করেছিলেন, জরুরি অবস্থা জারি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। জরুরি অবস্থা ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলাসহ বাইরের হুমকি সামলানো যাবে না। জরুরি অবস্থা কাজে লাগিয়ে দেশের বিশৃঙ্খল অবস্থাকে শৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

তবে সমালোচকেরা এই জরুরি অবস্থাকে ভারতের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে ভারতের প্রজাতন্ত্রের আত্মাকেই স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

১৯৭৭ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত জরুরি অবস্থা বহাল ছিল। অভিযোগ আছে, ২১ মাসের জরুরি অবস্থা চলাকালে ভারতে মৌলিক অধিকার স্থগিত ছিল, রোধ করা হয়েছিল সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ। রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন করা হয়েছিল নির্মমভাবে।

জরুরি অবস্থা জারি করাসহ নানা বিতর্কিত ও অজনপ্রিয় কর্মকাণ্ডের কারণে ইন্দিরা ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা তলানিতে নেমে গিয়েছিল। এর ফলস্বরূপ ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে তিনি নিজের আসনে হেরে যান। নির্বাচনে তাঁর দলেরও ভরাডুবি হয়। তবে ১৯৮০ সালের নির্বাচনে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ইন্দিরা আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন।

ইন্দিরার জন্ম ১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর। বাবা পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। মা কমলা নেহরু। দাদা মতিলাল নেহরু।

মতিলাল ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর ছেলে জওহরলালও ছিলেন ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম নেতা এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।

পিতামহ ও পিতার পথ ধরে ইন্দিরা শৈশব-কৈশোরেই ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলেন। এমনকি ২৫ বছর বয়সেই তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। তিনি ২৪৩ দিন কারাবন্দী ছিলেন।

ইন্দিরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন। এক বছর করে পড়েছেন শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী ও অক্সফোর্ডের সামারভিল কলেজে। তবে তিনি পড়ালেখা শেষ করতে পারেননি।

১৯৩৮ সালে ইন্দিরা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে তিনি ফিরোজ গান্ধীকে বিয়ে করেন। ফিরোজ ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামী, রাজনীতিক, সাংবাদিক। ইন্দিরা-ফিরোজ দম্পতির দুই ছেলে। রাজীব ও সঞ্জয় গান্ধী।

ইন্দিরা ১৯৫৫ সালে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হন। ১৯৫৮ সালে তিনি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সংসদীয় পর্ষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী নির্বাচিত হন ১৯৫৯ সালে।

১৯৬৪ সালে ইন্দিরার বাবা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু মারা যান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলালের উত্তরসূরি হন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। তিনি ইন্দিরাকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী করেন। ১৯৬৪-৬৬ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন ইন্দিরা। এ ছাড়া ১৯৬৪ সালেই তিনি ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য হন। দুই বছর পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু হলে তিনি ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

ভারতের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে হওয়ার ইন্দিরার রক্তেই ছিল রাজনীতি। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ভারতের মতো একটি বিশাল এবং নানা ধর্ম–মতের দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। সরকারপ্রধান, দলীয় প্রধান হিসেবে তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে বন্ধুর পথ, নিতে হয়েছে কঠিন কঠিন সব সিদ্ধান্ত।

ইন্দিরার নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে সে সময়ে তুমুল আলোচনা–সমালোচনা হয়েছিল। দেশে জরুরি অবস্থা জারি অথবা অপারেশন ব্লু স্টার—কয়েক দশক আগে তাঁর নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল নাকি ভুল ছিল, তা নিয়ে এখনো তীব্র বিতর্ক রয়েছে।

১৯৬৬ সালে ২৪ জানুয়ারি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মৃত্যুর আগপর্যন্ত টানা প্রায় ১৮ বছরে তিনি ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এই ১৮ বছরের মধ্যে তিন বছর তিনি ক্ষমতায় ছিলেন না।

ইন্দিরাকে নিয়ে ভারতীয় সমাজে বিভক্তি সব সময়ই ছিল। কেউ তাঁকে বলতেন ‘মাদার ইন্দিরা’, আবার কেউ তাঁকে কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে দেখতেন।

ইন্দিরাকে নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যা–ই থাকুক, তাঁর নেতৃত্ব যে ভারতকে বদলে দিয়েছিল এবং দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল, তা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

ইন্দিরা নিহত হওয়ার পর তাঁর বড় ছেলে রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। পরে তাঁকেও মায়ের মতো একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছিল।

তথ্যসূত্র: পিএম ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে, ফক্স নিউজ, ফার্স্টপোস্ট ডটকম

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ