নীতি সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নই জাপানি বিনিয়োগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:২৩ AM

স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন জাপান–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতিকে কীভাবে দেখছেন?
তারেক রাফি ভূঁইয়া: বাংলাদেশ–জাপানের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি পারস্পরিক আস্থা। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে ক্রমেই বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ অংশীদারত্বের দিকে এগিয়েছে। মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল—এই অগ্রগতির দৃশ্যমান উদাহরণ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জাপানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের আগ্রহ দেখাচ্ছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে দুদেশের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ। আমার দৃষ্টিতে, দুই দেশ সম্পর্ক বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে আছে। সঠিক নীতি গ্রহণ, নীতির ধারাবাহিকতা ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে আগামী দশকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ব্যবসায়িক অংশীদার হতে পারে।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন?
তারেক রাফি ভূঁইয়া: জাপানি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মূল আকর্ষণ বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যয় এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। বর্তমানে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, অটোমোবাইল ও যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, লজিস্টিকস ও গুদামজাতকরণ, আইসিটি, ওষুধ ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিত্যব্যবহার্য ভোক্তা পণ্য। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল উৎপাদন খরচ কমানোর ওপর জোর দেয় না; তাদের মূল অগ্রাধিকার নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা, পণ্যের ধারাবাহিক মান, সঠিক সময়ে সরবরাহ, দক্ষ জনবল এবং একটি পূর্বাভাসযোগ্য নীতি-পরিবেশ।
বাংলাদেশে জাপানের বড় ব্যবসা কোন খাতে?
তারেক রাফি ভূঁইয়া: জাপানের সবচেয়ে দৃশ্যমান উপস্থিতি এখনো দেশের অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে। বেসরকারি খাতেও জাপানের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে; যার মধ্যে অটোমোবাইল ও মোটরসাইকেল, তামাক, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল সোর্সিং, ভোক্তা পণ্য, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, ট্রেডিং, লজিস্টিকস, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন খাত উল্লেখযোগ্য।
তবে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্পর্ক কেবল পণ্য বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশভিত্তিক শিল্প উৎপাদন, আঞ্চলিক সরবরাহকেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ খাতে জাপানি বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি এখান থেকে তৃতীয় দেশে পণ্য ও সেবা রপ্তানির কৌশলগত সুবিধা হবে আগামী দিনে জাপানি বিনিয়োগের প্রধান আকর্ষণ।
চীনা গাড়ি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির উত্থানের মধ্যে বাংলাদেশে জাপানি গাড়ির বাজার কোন দিকে যাচ্ছে?
তারেক রাফি ভূঁইয়া: বাংলাদেশের অটোমোবাইলের বাজারে জাপানি গাড়ির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। তবে এখন আর শুধু ব্র্যান্ডের সুনামের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে চীনা ব্র্যান্ডগুলো প্রতিযোগিতামূলক দাম, আকর্ষণীয় ফিচার, সহজ অর্থায়ন ও আধুনিক ইভি প্রযুক্তি নিয়ে বাজারে এসেছে। ফলে জাপানি ব্র্যান্ডগুলোকে নতুন করে ভাবতে হবে। বাংলাদেশেই সংযোজন কারখানা, স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদন, সাশ্রয়ী হাইব্রিড ও ইভি মডেল তৈরির মতো সুসংগঠিত ইকোসিস্টেম তৈরির দিকে আগাতে হবে।
অবশ্য বিদ্যমান বিদ্যুৎ গ্রিড বর্তমানে স্বল্পসংখ্যক ইভি সামলাতে পারলেও ব্যাপক ইভি গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এর জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং অটোমোবাইল খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পথনকশা দরকার।
জাপানের সঙ্গে ইপিএ বাস্তবায়নের অগ্রগতি কত দূর এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কীভাবে উপকৃত হবে?
তারেক রাফি ভূঁইয়া: গত ৬ ফেব্রুয়ারি ইপিএ স্বাক্ষর হয়েছে। এটি বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর শুধু সরকারি ঋণ ও প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বেসরকারি খাতের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সেবা ও দক্ষ মানবসম্পদের গতিশীলতার জন্যও এই চুক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি করেছে। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা আগের মতো থাকবে না। সেই বিবেচনায় ইপিএ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কৌশলগত চুক্তি। এখানে আরেকটি বিষয় বলা দরকার, শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার থাকলেই শুধু রপ্তানি বাড়বে না। ইপিএ মূলত জাপানের বাজার প্রবেশের একটি উন্মুক্ত দরজা। তবে সেখানে সাফল্যের জন্য বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাপানি মানের পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে।
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনায় জাপানি উদ্যোক্তারা প্রধানত কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন?
তারেক রাফি ভূঁইয়া: জাপানি উদ্যোক্তারা নীতি ও সিদ্ধান্তের পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। কর, ভ্যাট ও কাস্টমস আইনের প্রয়োগে অসামঞ্জস্যতা, পূর্বানুমান ছাড়া হঠাৎ এসআরও বা নীতি পরিবর্তন, এইচএস কোড ও শুল্ক মূল্যায়ন নিয়ে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি ভোগায়। পাশাপাশি ভ্যাট রিফান্ডে অতিরিক্ত সময়, বৈদেশিক মুদ্রার অপর্যাপ্ততা, ব্যাংকিং নথিপত্রের জটিলতা, মুনাফা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বাধা এবং একই নথি একাধিক সরকারি সংস্থায় জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ব্যবসায়িক গতি কমিয়ে দেয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরসহ সরবরাহশৃঙ্খলে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় হয়। গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষ মানবসম্পদেরও অভাব রয়েছে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম মেনে চলতে পুরোপুরি প্রস্তুত, তবে তারা জানতে চায়, নিয়মগুলো কতটা স্পষ্ট, এগুলো কত দিন অপরিবর্তিত থাকবে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পেতে কত সময় লাগবে। নতুন কোনো প্রণোদনার চেয়ে এসব বিষয় বিনিয়োগ বাড়াতে বেশি সহায়ক হবে। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময় জাপানি বিনিয়োগকে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে নীতি ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে এখনো ব্যবধান রয়েছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল, বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল জাপানি বিনিয়োগের চিত্র কতটা বদলে দিচ্ছে?
তারেক রাফি ভূঁইয়া: এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো একটি সমন্বিত অবকাঠামো। মাতারবাড়ী বন্দরের মাধ্যমে সরাসরি জাহাজ ভেড়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় যাতায়াত সময় ও খরচ উভয়ই কমবে। জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল একটি পরিকল্পিত শিল্পভিত্তি দিচ্ছে। মেট্রোরেল রাজধানীর মানুষের গতিশীলতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।
তবে মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাজিমা করপোরেশনের মতো বড় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সরে যাওয়া একটি সতর্কসংকেত। এমন বিলম্ব চলতে থাকলে অন্যান্য জাপানি প্রতিষ্ঠানও নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারে, যা পুনরায় দরপত্র আহ্বান, ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়সীমার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। সরকার চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে থার্ড টার্মিনালের আংশিক কার্যক্রম শুরুর কথা জানিয়েছে। বর্তমানে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে আনুষ্ঠানিক দর-কষাকষি চলছে। চুক্তি ও সার্বিক পরিচালন প্রস্তুতি সময়মতো শেষ হলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে জেবিসিসিআই কী কাজ করছে?
তারেক রাফি ভূঁইয়া:২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত জাপান–বাংলাদেশ চেম্বার দুই দশকের বেশি সময় ধরে উভয় দেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে এই চেম্বার ইপিএ ও নিয়মনীতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি; জাপানি বিনিয়োগকারীদের কর, শুল্ক, ব্যাংকিং ও ভিসা–সংক্রান্ত সমস্যা কমানো এবং আইটি, চামড়া, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতের সম্ভাবনা জাপানিদের কাছে তুলে ধরার কাজ করছে। চেম্বারের মূল লক্ষ্য শুধু নতুন বিনিয়োগ আনা নয়, বরং বাংলাদেশে বিদ্যমান জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্য নিশ্চিত করা। কারণ, একজন সন্তুষ্ট বিনিয়োগকারীই নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সবচেয়ে বড় দূত হিসেবে কাজ করে।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
তিন বছরের বেশি সময় পর সুদ বাড়াল ফেডারেল রিজার্ভ, বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৩৬ AM · প্রথম আলো
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পুনঃ অর্থায়ন চুক্তি সই মধুমতি ব্যাংকের
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:১০ PM · প্রথম আলো
