শাহজাদপুর সংবাদ

নতুন ঋণেও আইএমএফের পুরোনো শর্ত, রাজস্ব সংস্কার কতটা এগোল

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৯:৩০ AM

নতুন ঋণেও আইএমএফের পুরোনো শর্ত, রাজস্ব সংস্কার কতটা এগোল

রাজস্ব খাত সংস্কার উদ্যোগে গতি এসেছে। সংস্কার উদ্যোগগুলোর অন্যতম হলো—জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও আদায়—দুই আলাদা বিভাগ করা; একক মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট নির্ধারণ; শুল্ক–কর কর ছাড় কমিয়ে আনা ইত্যাদি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আগের ঋণ কর্মসূচির জন্য এসব সংস্কারের শর্ত ছিল। আগের ঋণ কর্মসূচি বাতিল করে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ।

দুই থেকে তিন মাস ধরে এই আলোচনা চলছে। নতুন ঋণ কর্মসূচিতেও একই ধরনের শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে। এই কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রাথমিক আলোচনা চলছে। নতুন কর্মসূচির মেয়াদ হবে তিন বছর।

গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক যৌথ সভার সাইডলাইন বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আইএমএফ কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। সেখানে রাজস্ব খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে মূলত রাজস্ব খাত সংস্কারের উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি নিয়ে কথা হয়। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

পুরোনো ঋণ কর্মসূচির আওতায় দেওয়া শর্ত অনুসারে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও আদায় বিভাগ আলাদা করার শর্ত ছিল। শুল্ক–করসংক্রান্ত নীতি করবে সরকারের একটি বিভাগ এবং মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায় করবে আরেকটি বিভাগ। বর্তমানে এনবিআর দুটি কাজই করে।

অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি। বর্তমান সরকার বিষয়টি পর্যালোচনা করতে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। ইতিমধ্যে সেই কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে।

আইএমএফ একক ভ্যাট হার নির্ধারণের কথা বলে আসছে। ব্যাংককের বৈঠকেও এ নিয়ে অগ্রগতি জানতে চেয়েছে বলে জানা গেছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, একাধিক ভ্যাট হার বাদ দিয়ে একক ভ্যাট হারে যাওয়ার জন্য একটি সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা করেছে এনবিআর। ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে হ্রাসকৃত ভ্যাট হারগুলো তুলে দেওয়া হবে। ২০৩০ সালে দেশে একক ভ্যাট হার করতে চায় এনবিআর। আইন অনুসারে একক ভ্যাট হার হবে ১৫ শতাংশ। তবে এই একক ভ্যাট হার কমানো নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। ব্যবসায়ীরা সাড়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত একক ভ্যাট হারের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ভ্যাটের হার রয়েছে মূলত ১০টি। এগুলো হলো ১৫, ১০, ৭.৫, ৫, ৪.৫, ৪, ২.৪, ২, ১.৫ ও ০ শতাংশ। তবে বেশির ভাগ পণ্য ও সেবায় ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ।

আইএমএফের আগের ঋণে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে যৌক্তিকভাবে সব ধরনের কর ছাড় বাদ দেওয়ার শর্ত ছিল। নতুন ঋণেও একই ধরনের শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। সেখানে এনবিআরের অবস্থান হলো, অর্থনীতি ও ব্যবসা–বাণিজ্য সম্প্রসারণের স্বার্থে একেবারে সব কর ছাড় উঠিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। রাজস্ব খাতের অটোমেশন জোর দেওয়া—আইএমএফের এই শর্তের সঙ্গে একমত এনবিআর।

রাজস্ব খাত সংস্কারের কথা দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। দাতারাও এ কথা বলছেন। বাংলাদেশ হলো বিশ্বের সবচেয়ে কম কর–জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর একটি। এই হার ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গত কয়েক বছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি নেই।

খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু আইএমএফের শর্ত নয়, অর্থের জোগানের প্রয়োজনেই এনবিআরকে সংস্কার করতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, কর ছাড় কমানো, নীতি ও আদায় কার্যক্রম আলাদা করাসহ রাজস্ব খাতে সংস্কার লাগবেই। আগের ঋণ কর্মসূচির মতো এবারও আইএমএফের একই শর্ত তাদের অবস্থানের পরিবর্তন তো হবে না। একই ধরনের সংস্কারের অগ্রাধিকারের কথা দেশের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। এসব সংস্কার করতেই হবে, যত দ্রুত করা যায়, ততই ভালো।

মানুষের হয়রানি কমাতে রাজস্ব আদায় ও নীতি—দুটি আলাদা বিভাগ করা জরুরি বলে মনে করেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশে রাজস্ব নীতি ও আদায়—দুটি আলাদা সংস্থা করে থাকে।

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, এনবিআর নিজেই একটি বিভাগ হবে। তারা রাজস্ব আদায় করবে। কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি মন্ত্রীর দপ্তরে রিপোর্ট করবে। নীতি বিভাগ থেকে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করবে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ