দেশে অতিরাজনীতি শুরু হয়েছে, আমরা দায়িত্ব নিয়েছি তোমাদের জন্য, শিক্ষার্থীদের শিক্ষামন্ত্রী
১১ আগস্ট, ২০২৬ এ ৩:৫২ PM

শিক্ষা খাতের নানা সংকট ও রাজপথের অস্থিতিশীলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের নিজেদের শিক্ষা ও গবেষণায় মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দেশের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের জন্য সরকার যখন নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন ঘনঘন অহেতুক আন্দোলন রাষ্ট্রকে অচল করার নামান্তর। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) মিলনায়তন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘দেশে অতিরাজনীতি শুরু হয়েছে। একটি সরকারের বয়স ছয় মাস না হতেই নানা অজুহাত দিয়ে যারা রাজনীতি করে, তারা মূলত এই দেশের উন্নতি চায় না, তারা অধঃপতন চায়...শিক্ষার্থীদের বলব, আমরা দায়িত্ব নিয়েছি তোমাদের জন্য, আমরা কাজ করছি তোমাদের জন্য। ভেবেচিন্তে আন্দোলন করো।’ এরপরও কেউ আন্দোলন করতে চাইলে সরাসরি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসো, আমি তোমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেব। তবু বিনা কারণে হইচই করে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে না।’
‘এডুকেশন ফর অ্যা রোবাস্ট ইকোনমি: স্কিলস, ল্যাঙ্গুয়েজ, অ্যান্ড গ্লোবাল ইকোনমি’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজক এডুকেশন রিফর্ম ইনিশিয়েটিভ (ইআরআই)।
গত ২০ বছরে দেশের শিক্ষা খাত অনেকটা পেছনের দিকে হেঁটেছে বলেও সেমিনারে মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, এ বছর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয় কোনো কৃত্রিম বিষয় নয়, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্যই এবার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা হয়েছে।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষা খাতে জিডিপির নিট ২ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে প্রাথমিকে ৫০ হাজার এবং মাধ্যমিক ও কলেজে হাজার হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া আইনি জটিলতা ও ব্যাকলগ কাটিয়ে এনটিআরসিএ এবং পিএসসির মাধ্যমে দ্রুত স্বচ্ছ নিয়োগের চেষ্টা চলছে।
৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কেউ পাস করেনি। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেন শিক্ষামন্ত্রী। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কর্মসংস্থানহীন সনাতন বিষয়ে অনিয়ন্ত্রিত অনার্স কোর্স খোলা বন্ধ রাখা হয়েছে এবং উচ্চশিক্ষায় বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ওপর জোর দেন মন্ত্রী।
সম্প্রতি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে চলে যাওয়া প্রসঙ্গ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল প্রচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, এ–সংক্রান্ত একটি অসম্পূর্ণ খসড়া ফেসবুক বা সংবাদমাধ্যমে দেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে মন্ত্রী ‘অনভিপ্রেত’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বাংলাদেশে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবিক অবস্থা হলো আমাদের বৃহৎ জনসংখ্যা এখন এক প্রকার সমস্যায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র উপযোগী শিক্ষা প্রদানের জন্য জোর দেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকদের প্রধান কাজ হলো গবেষণা করা। আর উপাচার্যদের বলতে চাই, আপনারা দয়া করে এমন একটি ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করুন, যাতে জুলাইয়ের এক তারিখে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে গেলে জুনের ৩০ তারিখে তাঁরা ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে যেতে পারেন।’
সংকট কাটাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নয়, শিক্ষার্থীরা কী শিখছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। তিনি বলেন, শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে শুধু বড় জিডিপি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, বহুমুখী উৎপাদন ও উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান। বাংলাদেশের ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে বলে মত দেন তিনি। বর্তমানে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু শিক্ষার সম্প্রসারণের সঙ্গে দক্ষতা ও কর্মসংস্থান একই হারে বাড়েনি। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে। অনেক তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সংকট কাটাতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে পড়া, লেখা, গণিত ও যুক্তির মতো মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এসব ভিত্তি দুর্বল হলে পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি, এআই বা অন্য জটিল দক্ষতা অর্জন কঠিন হবে।
শিক্ষায় একই সঙ্গে স্টিম শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ বা টিভেটের মান বাড়াতে হবে উল্লেখ করে নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে সংযোগ তৈরি করা। ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, মান্দারিনসহ বিদেশি ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির সুযোগ বাড়বে।’
জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘আমরা শিক্ষায় পরিমাণগত সম্প্রসারণ দেখেছি। উচ্চশিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। আবার অনেক তরুণ বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে সেখানে সেবা দিচ্ছে। তাহলে আমাদের দেশের কী হবে? আমরা কি এই দেশ সম্পর্কে কিছুই ভাবব না?
বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘বাংলাদেশের বাস্তবতায় যে যত বেশি পড়াশোনা করছে, সে ততবেশি বেকার থাকছে। প্রতিবছর ২০ লাখের বেশি তরুণ শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। যাদের বেশির ভাগের চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। তাই আমাদের শিক্ষায় এমন বিষয়গুলো যোগ করতে হবে, যার মাধ্যমে শিক্ষা জীবনে প্রতিটি শিক্ষার্থী চাকরির জন্য মৌলিক দক্ষতা নিয়ে বের হতে পারে।
মার্কপলো এআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাসফিয়া তাসবিন বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে যখন সবাই বলছেন দেড় হাজার পদের বিপরীতে আবেদন আসছে ২১ লাখ, সেখানে আমাদের প্রতিষ্ঠানে যোগ্য মানুষ আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে আমরা সার্টিফিকেটেটের চেয়ে যোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।’
সাংবাদিক ফারাবি হাফিজের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিয়োজিত ইউনেস্কো প্রতিনিধি সুশান ভাইজ, ইউসেফ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল করিম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান প্রমুখ।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
তোমার জীবনের গল্প শেষ হয়নি, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখাই হয়নি, ফেসবুকে এসএসসিতে অকৃতকার্যদের শিক্ষামন্ত্রী
১১ আগস্ট, ২০২৬ এ ৪:৩২ PM · প্রথম আলো
এসএসসি উত্তীর্ণদের একাদশে ভর্তি নিয়ে যা বলছে নটর ডেম কলেজ
১১ আগস্ট, ২০২৬ এ ১১:২১ AM · প্রথম আলো
এসএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণ শুরু, কীভাবে আবেদন জানাল শিক্ষা বোর্ড
১১ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:০৩ AM · প্রথম আলো
