দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় খলিফা ওমরের কালজয়ী ৬ পদক্ষেপ
১৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৫:০০ PM

হিজরি ১৮ সনের দিকে মুসলিম সাম্রাজ্য পরপর দুটি ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছিল—একদিকে হিজাজ অঞ্চলে নেমে এসেছিল স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ‘আম আর-রামাদাহ’, অন্যদিকে শাম অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধি ‘আমওয়াস মহামারী’।
খলিফা ওমর (রা.) যেভাবে এগুলো মোকাবিলা করেছিলেন, তা একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক প্রজ্ঞা এবং জনকল্যাণমূলক শাসনের উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে রয়েছে।
হিজরি ১৭ সনের শেষভাগ থেকে ১৮ সনের শুরু পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় নয় মাস হিজাজ এলাকায় অনাবৃষ্টি ও অনাবাদি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে শস্যখেত শুকিয়ে যায়, গবাদিপশু মারা পড়ে এবং সমগ্র মদিনা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষুধা ও অনাহার ছড়িয়ে পড়ে।
এই দুর্যোগকে ‘আম আর-রামাদাহ’ (ভস্মের বছর) বলা হয়। কারণ, দীর্ঘ অনাবৃষ্টির কারণে মাটি ধূলিসাৎ হয়ে কালো ও শুকিয়ে ছাই-ভস্মের রূপ নিয়েছিল। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/৩১৬, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)
সংকট দেখা দেওয়ার পরপরই খলিফা ওমর (রা.) মদিনার কেন্দ্রীয় বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেন। কোষাগারে রক্ষিত সমস্ত খাদ্যশস্য ও গচ্ছিত অর্থ অনাহারী মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেন, এমনকি একপর্যায়ে মদিনার বাইতুল মাল সম্পূর্ণরূপে শূন্য হয়ে যায়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৯১, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৬)
কিন্তু সংকট এত বিশাল ছিল যে শুধু মদিনার আঞ্চলিক সম্পদে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। মরুভূমির দূর-দূরান্ত থেকে উপজাতিরা খাদ্যের আশায় মদিনায় ভিড় জমাতে শুরু করে এবং পুরো বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
খলিফা ওমর (রা.) দ্রুত অন্যান্য প্রদেশের গভর্নরদের কাছে জরুরি সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সাম্রাজ্যের এক অংশে দুর্ভিক্ষ হলেও যেসব অঞ্চলে আল্লাহর রহমতে উদ্বৃত্ত খাদ্য রয়েছে, সেগুলোর সঠিক ব্যবহার ছাড়া এই দুর্যোগ থেকে নিস্তার নেই।
তিনি ইরাকের গভর্নর আবু মুসা আশআরি (রা.) এবং ফিলিস্তিন ও মিসরের প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত আমর ইবনুল আসের কাছে চিঠি লেখেন। আকুলতার সঙ্গে উল্লেখ করেন, “হে আল্লাহর বান্দারা, উম্মতের এই চরম বিপদে তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসো।”
খলিফার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে খাদ্য ও রসদবোঝাই বিশাল উটের কাফেলা মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আমর ইবনুল আস (রা.) সমুদ্রপথে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে লোহিত সাগরের উপকণ্ঠে জেদ্দা বন্দরে খাদ্যের জাহাজ পাঠান এবং সেখান থেকে স্থলপথে দ্রুত হিজাজে খাদ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।
পুরো ত্রাণ বিতরণ প্রক্রিয়া সুশৃঙ্খল করতে খলিফা তদারকি কমিটি গঠন করেন যাতে প্রতিটি অনাহারী পরিবার সুষমভাবে খাদ্য সাহায্য পায়।
জরুরি পরিস্থিতিতে ইসলামের কিছু বাহ্যিক অনুশাসন প্রয়োগে খলিফা ওমর (রা.) যে নমনীয়তা প্রদর্শন করেছিলেন, তা ইসলামি আইনশাস্ত্রের এক যুগান্তকারী অধ্যায়। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে স্বাভাবিক সময়ের আইন ও নিয়মাবলি দুর্ভিক্ষের মতো আপদকালীন সময়ে হুবহু বজায় রাখা মানবিকতার পরিপন্থী হতে পারে।
তিনি সাধারণ মানুষের ওপর থেকে জাকাত ও কর আদায় স্থগিত করেন। জাকাত সংগ্রাহকদের লোকালয়ে পাঠাল থেকে বিরত রাখেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে তা আদায়ের ব্যবস্থা করেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/৩১৭, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)
এমনকি এ সময় তিনি স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করেন, “জীবন বাঁচানোর তাগিদে খাদ্যাভাবের কারণে কেউ চুরি করলে তার হাত কাটা যাবে না।” (আস-সাল্লাবি, উমার ইবনুল খাত্তাব: সাহাবিয়্যুন জালিলুন ওয়া খালিফাতুন আদিলুন পৃ. ৩৫২, মুয়াসসাসাতু ইকরা, কায়রো, ২০০৭)
এ সময় ওমর (রা.) নিজের ব্যক্তিগত জীবনেও এক অভূতপূর্ব ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি নীতি গ্রহণ করেছিলেন যে যতক্ষণ না সাধারণ জনগণ পুষ্টিকর খাদ্য পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি নিজে কোনো উন্নত খাবার স্পর্শ করবেন না।
তিনি ঘি, দুধ ও গোশত খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। একবার তার সেবক বেশি দামে কিছুটা ঘি ও দুধ কিনে আনলে তিনি তা সাধারণ দরিদ্রদের মাঝে সদকা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে কষ্ট আমার প্রজারা ভোগ করছে, সেই কষ্ট যদি আমি নিজে অনুভব না করি, তবে তাদের কল্যাণ কীভাবে আমার মনকে স্পর্শ করবে?”
দিনের পর দিন শুধু সিরকা ও জয়তুনের তেল দিয়ে শুকনো রুটি খাওয়ার কারণে খলিফার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছিল এবং খাদ্যাভাবে তাঁর গায়ের উজ্জ্বল রং তামাটে ও কালো হয়ে গিয়েছিল। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৯২, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৬)
তিনি আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি ও দোয়ায় রাত কাটাতেন, যেন তাঁর কোনো ভুলের কারণে এই জাতি ধ্বংস হয়ে না যায়। দীর্ঘ নয় মাস পর আল্লাহর রহমতে বৃষ্টি বর্ষিত হলে এই দুর্ভিক্ষের অবসান ঘটে।
দুর্ভিক্ষের ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই হিজরি ১৮ সনে শাম অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ‘আমওয়াস মহামারী’। ফিলিস্তিনের আমওয়াস নামক ছোট একটি শহর থেকে এই ছোঁয়াচে ব্যাধি মহামারী আকারে পুরো সিরিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
এই মহামারীতে আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ, মুআজ ইবনে জাবাল ও ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান (রা.)-এর নবীজির বহু বিখ্যাত সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন।
পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য খলিফা ওমর (রা.) নিজেই মদিনা থেকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি যখন ‘সারগ’ নামক স্থানে পৌঁছান, তখন সিরিয়ার সামরিক অধিনায়করা তাঁকে মহামারীর ভয়াবহতার কথা জানান।
খলিফা একক সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরামর্শ সভা (শুরা) আহ্বান করেন। অধিকাংশ প্রাজ্ঞ ব্যক্তি পরামর্শ দেন যে মহামারী অঞ্চলে খলিফা ও তাঁর সঙ্গীদের প্রবেশ করা যুক্তিসঙ্গত হবে না।
খলিফা ওমর (রা.) মদিনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.) প্রশ্ন তোলেন, “আপনি কি নিয়তি থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন?” জবাবে খলিফা বলেন, “আবু উবাইদাহ, তুমি ছাড়া অন্য কেউ যদি এ কথা বলত! হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তকদির থেকে বেঁচে আল্লাহর অন্য তকদিরের দিকেই ধাবিত হচ্ছি।”
তিনি একটি উপমা দিয়ে বোঝান, কারো কাছে যদি উটের পাল থাকে এবং সামনে দুটি উপত্যকা থাকে—একটি উর্বর ও ঘাসে ভরা, অন্যটি অনুর্বর; তবে যে উপত্যকাতেই উট চরানো হোক না কেন, তা আল্লাহর তকদিরের অনুসারেই হবে।
সাহাবি আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) এসে নবীজির হাদিস শোনান, “যখন তোমরা কোনো এলাকায় মহামারীর খবর শুনবে, তখন সেখানে প্রবেশ করবে না। আর যদি তোমরা কোনো এলাকায় অবস্থানকালে সেখানে মহামারী দেখা দেয়, তবে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হবে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭২৯)
শুনে খলিফা ওমর (রা.) আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং মদিনায় ফিরে যান। এটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ‘কোয়ারেন্টাইন’ বা সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের সর্বপ্রাচীন ও সফল প্রয়োগ।
প্লেগের কারণে শাম অঞ্চলে বহু জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মৃত্যুবরণ করায় সেখানে বড় ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে হাজারো মানুষের অকালমৃত্যুর কারণে ওয়ারিসদের মাঝে সম্পত্তি বণ্টন ও সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দিয়েছিল।
খলিফা ওমর (রা.) সশরীরে শাম সফরে যান এবং সেখানকার প্রশাসনিক পুনর্গঠন করেন। তিনি খালি হওয়া পদগুলোতে যোগ্য নতুন গভর্নর নিয়োগ করেন, মৃত ব্যক্তিদের রেখে যাওয়া সম্পদের সঠিক উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।
এই সকল পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়কের কাজ শুধু সংকট মোকাবিলা করাই নয়, বরং সংকট-উত্তর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে সমাজকে পুনরায় সচল করাও তাঁর প্রাথমিক দায়িত্ব। (মুওয়াফফাক সালিম নুরি, আল-আখলাক ওয়াস-সিয়াসাহ: কিরাআতুন ফি খিলাফাতি উমার ইবনিল খাত্তাব, পৃ. ১১২, ইদারাতুল বুহুস ওয়াদ দিরাসাত আল-ইসলামিয়্যাহ, দোহা, ২০১২)
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
জলজ ভাবনায় হারিয়ে যেতে বসা নদী ও জীবন-সংস্কৃতির আখ্যান
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১০:৫৬ PM · বাংলা ট্রিবিউন
