দাম্পত্য কলহ রোধে নবীজির ৪ নির্দেশনা
২২ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:০০ PM

দাম্পত্যজীবনে কখনো মনোমালিন্য হয়, কখনো একে অন্যের প্রতি ভালো লাগা কমে যায়, আবার কখনো সন্দেহ ও অবিশ্বাস সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। এসব পরিস্থিতিতে মানুষের আচরণই নির্ধারণ করে, সম্পর্কটি ভাঙনের দিকে যাবে, নাকি নতুন করে গড়ে উঠবে।
দাম্পত্যজীবনের এমন কিছু সমস্যা নিয়ে সাহাবিরাও নবীজি (সা.) কাছে আসতেন। তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁদের দিকনির্দেশনা দিতেন। তাঁর এসব দিকনির্দেশনায় একই সঙ্গে দাম্পত্যজীবনের বাস্তবতা ও মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে গভীর উপলব্ধির প্রকাশ ঘটে।
দাম্পত্য কলহ রোধে নবীজি (সা.) এমন চারটি নির্দেশনা এখানে তুলে ধরা হলো।
জীবিকার তাগিদে পুরুষ মানুষকে দিনের বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। অনেক সময় না চাইতেও অন্য নারীর দিকে চোখ পড়ে, ক্ষেত্রবিশেষ কারও প্রতি ভালো লাগাও তৈরি হতে পারে। ধীরে ধীরে নিজ স্ত্রীর প্রতি অনাগ্রহ জন্মে, সেখান থেকে সম্পর্ক কলহে গড়ায়।
এমন পরিস্থিতিতে নবীজি (সা.) দিকনির্দেশনা হলো, যদি পরনারীর দিকে দৃষ্টি পড়ার কারণে মনে আগ্রহ তৈরি হয়, যতদ্রুত সম্ভব নিজের স্ত্রীর কাছে ফিরে যাওয়া এবং তাঁকে সময় ও সঙ্গ দেওয়া। কারণ, অন্য নারীর মধ্যে যা রয়েছে, নিজের স্ত্রীর মধ্যে তা-ই রয়েছে। (মেশকাত, হাদিস: ৩১০৮; সুনানে দারিমি, হাদিস: ২১৪৭)
মহানবী (সা.) এই বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন যে কাউকে ভালো লাগলেই তাঁর পেছনে ছোটা যাবে না। ঘরসংসার একটি দায়িত্ব, এই দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করতে গেলে সেই পরনারীও বর্তমান স্ত্রীর মতো হয়ে যাবে। তাই নিজের স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
শুধু শরীরী আকর্ষণের জন্য আরেকটি বিয়ে করাকে হাদিসে নিন্দা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘তোমরা দোষ ছাড়া নারীদের তালাক দিয়ো না। কেননা আল্লাহ এমন নারী ও পুরুষকে পছন্দ করেন না, যারা একের পর এক বিয়ে করে ও তালাক দেয়।’ (আল জামিউস সগির, সুয়ুতি, হাদিস: ৯৮২৫)
দাম্পত্যজীবনে সঙ্গীর কোনো স্বভাব অপছন্দ হতে পারে। সেই একটি দোষকে কেন্দ্র করে পুরো মানুষটিকে ঘৃণা করা কিংবা তালাকের কারণ খুঁজতে থাকা উচিত নয়।
আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ করো, তবে এমন হতে পারে যে, তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করছো, অথচ আল্লাহ তাতে প্রচুর কল্যাণ রেখেছেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৯)
মহনবী (সা.) বলেন, ‘কোনো ইমানদার পুরুষ যেন কোনো ইমানদার নারীকে (স্ত্রী) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৯)
সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হলে একজন অপরজনের শুধু মন্দদিকগুলো নিয়ে কথা বলে। কিন্তু নবীজি (সা.) আমাদের ভিন্ন একটি বাস্তবতার দিকে ইশারা করছেন। তিনি বলছেন, মন্দ দিক থাকলেও ভালো দিকও নিশ্চয় আছে। সেদিকে আমাদের চোখ দেওয়া জরুরি।
দাম্পত্য কলহের জেরে অনেক স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে কটুকথা বলে, গালগালাজ করে। অনেক সময় স্বামী স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে, তাকে প্রহার করে। এ ধরনের কাজ দাম্পত্যজীবনকে অসুখী করে তোলে।
নবীজি (সা.) সব সময় এমন কাজ করতে নিষেধ করেছেন। হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যে স্ত্রীকে প্রহার করে, সে ভালো মানুষ নয়। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৪১৮৯)
নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করে। (কেননা) এরপর দিনশেষে সে তার সঙ্গে সহবাস করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)
এক সাহাবি নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমাদের ওপর স্ত্রীদের অধিকার কী কী? এর উত্তরে নবীজি বলেন, তুমি যা খাবে, তাকেও তা খাওয়াবে; তুমি যা পরিধান করো, তাকেও তা পরাবে। তার মুখে আঘাত করবে না, তাকে কুৎসিত বলে গালি দেবে না এবং (তার সঙ্গে রাগ করে) তাকে আলাদা করে রাখলেও ঘরের মধ্যেই রাখবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২০০১৩)
স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়ার অভিযোগ শুনলে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবেগের বশে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, অস্পষ্ট প্রমাণের ওপর নির্ভর করে কিংবা ভিডিও, অডিও ও ছবি দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
এমনকি তাকে অন্যজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দেখলেও নিজ হাতে তাকে হত্যা করতে পারবে না। নবীজি (সা.) এ ধরনের পরিস্থিতিতেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি দেননি।
হাদিসে আছে, নবীজিকে সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.) জিজ্ঞাসা করেন, ‘কোনো পুরুষ যদি নিজের স্ত্রীকে কোনো অন্যের সঙ্গে দেখে—সে কি সেই লোকটিকে কতল করবে?’ আল্লাহর রাসুল (স) বলেন, ‘না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৯৮)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসরা বলেন, স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে দেখলেই স্বামী তাকে হত্যা করতে পারে না। বরং ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণের জন্য সাক্ষী হাজির করতে হবে এবং বিচার হতে হবে।
এ নিয়ম না থাকলে কেউ রাগের বশে বা আত্মসম্মানের অজুহাতে কাউকে হত্যা করে পরে দাবি করতে পারত যে নিহতজন ব্যভিচারে লিপ্ত ছিল। এতে নিরপরাধ মানুষের জীবন বিপন্ন হতো এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ত।
হাদিসে কঠোরভাবে আইনরক্ষার একটি বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়। সাহাবি হিলাল ইবনে উমাইয়া (রা.) তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে শরিক ইবনে সাহমাহর সঙ্গে ব্যভিচারের অভিযোগ আনেন।
নবীজি (সা.) তাঁকে বলেন, ‘তোমার অভিযোগের প্রমাণ আনো, নয়তো তোমার ওপর মিথ্যা অপবাদের শাস্তি কার্যকর হবে।’
পরে বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ায় গড়ায়। অভিযুক্ত নারী মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সেই নারী তাঁর পরকীয়া প্রেমিকের চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি সন্তান জন্ম দেন।
এতে তাঁর ব্যভিচারের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও নবীজি (সা.) তাঁকে শাস্তি দেননি। কারণ, ইতিমধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়ায় তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তবে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আল্লাহর কিতাবে বিধান নির্ধারিত না থাকলে এই নারী ও আমার মধ্যে অন্য রকম ঘটনা ঘটত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭৪৭)
এ কারণে স্বামী বা স্ত্রীর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ শুনলে একে কেন্দ্র করে দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি করা যাবে না। প্রথমে এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। পরে আইন রক্ষা করে যেকোনো সিদ্ধান্তে যেতে হবে।
মওলবি আশরাফ : আলেম, লেখক ও অনুবাদক
mawlawiashraf@gmail.com
সূত্র: প্রথম আলো
