শাহজাদপুর সংবাদ

ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন নিয়ে জামায়াতের ‘দ্বিমুখী’ আচরণের বিরুদ্ধে সরব এনসিপি

১ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৪৫ AM

ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন নিয়ে জামায়াতের ‘দ্বিমুখী’ আচরণের বিরুদ্ধে সরব এনসিপি

ঠাকুরগাঁও–১ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়ম ও জালভোটের অভিযোগ তোলে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কেন্দ্রীয় জামায়াত এমন অভিযোগ করলেও উপনির্বাচনে দলটির পরাজিত প্রার্থী বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানান। তাঁরা কোলাকুলি করেন, পরস্পরকে মিষ্টিমুখ করান। জামায়াতের এই ‘দ্বিমুখী’ আচরণের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা।

বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও–১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ হয়। প্রার্থী ছিলেন পাঁচজন। উপনির্বাচনে ২ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পান ৯৬ হাজার ৫১৩ ভোট। বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ৩১ হাজার ৪০৪।

এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। উপনির্বাচনে বিজয়ী ধানের শীষের প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই।

বৃহস্পতিবার উপনির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগেই অনিয়ম, জালভোট ও পোলিং এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয় জামায়াত।

পরদিন শুক্রবার দুপুরে ফুলের তোড়া নিয়ে জামায়াতের প্রার্থীর বাসায় যান মির্জা ফয়সল। এ সময় দুজন কোলাকুলি করেন, পরস্পরকে মিষ্টিমুখ করান। এলাকার উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তাঁরা।

ঠাকুরগাঁওয়ে যখন এ ঘটনা ঘটছিল, তখন ঢাকায় চিত্রটা ছিল উল্টো। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াত। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে আগে থেকেই ব্যালট পেপারে সিল মারা, জালভোট দেওয়া, কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

নির্বাচন কমিশনের প্রতি অভিযোগ জানিয়ে গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির সচিব ও প্রধান যদি অনিয়মকে অস্বীকার করেন, তাহলে বুঝতে হবে যাঁরা অনিয়ম করেছেন, তাঁদের সঙ্গে সিইসি ও ইসিসচিবের আঁতাত রয়েছে। তাঁরা সাংবিধানিক পদে বসে এই পদের প্রতি সুবিচার করেননি।

জামায়াতের এই ‘দ্বিমুখী’ আচরণের সমালোচনা করেছেন এনসিপি নেতারা। বিষয়টি নিয়ে প্রথম মুখ খোলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। এ নিয়ে সমালোচনা করেছেন সংসদ সদস্য ও এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ।

শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে এনসিপির গণবিক্ষোভ সমাবেশে আসিফ মাহমুদ এ বিষয়ে বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ে একটা উপনির্বাচন হয়েছে। সকাল থেকে আমরা দেখলাম বিভিন্ন জায়গায় প্রিসাইডিং অফিসাররা ব্যালটে সিল মেরে রেখেছেন, সেগুলো ধরাও খেয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমরা দেখি সরকারি প্রার্থী, তারপরে বিরোধী প্রার্থী—তাঁরা একে অপরকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন। আমাদের গণতন্ত্র খুবই সংকটময় এবং দুরবস্থার একটি সময় পার করছে।’

কেন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রাজনীতিতে এনসিপিকে দরকার—মিষ্টি খাওয়ার এই চিত্র সেটি দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট করেছে বলে মন্তব্য করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি আরও বলেন, কেন বাংলাদেশে একটা আপসহীন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দল দরকার, সেটিও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ বুঝে যাচ্ছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সুশাসন ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির জন্য এনসিপি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

এরপর কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের খুলনা বিভাগীয় লংমার্চের পথসভায় উপনির্বাচন প্রসঙ্গে কথা বলেন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় যশোরের মুড়লি মোড়ে আয়োজিত পথসভায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা এখানে যাঁরা উপস্থিত হয়েছি, আমরা হচ্ছি বিরোধী দল। বিরোধী দলকে মনে করা হয়, বিকল্প সরকার। আমাদের সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিতে হবে। বিরোধী দলের যে ধরনের ভূমিকা, সে ধরনের ভূমিকা আমাদের দেখাতে হবে।’

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ঢাকায় বলব, ভোটে কারচুপি হয়েছে, আবার ফলাফল মেনে নেব। এ ধরনের বিরোধী দলের ভূমিকা দেখালে হবে না। যদি কারচুপি হয়ে থাকে, চোখে চোখ রেখে বলতে হবে সেটা কারচুপি হয়েছে। আমরা একবার বলব কারচুপি হয়েছে, আবার গিয়ে মিষ্টি খাইয়ে আসব—এ ধরনের বিরোধিতা হতে পারে না।’

১১–দলীয় ঐক্যে থাকলেও সম্প্রতি জামায়াত থেকে সাংগঠনিক দূরত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে এর মাধ্যমে এনসিপি আলাদা দল হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রাখতে চায়। এরই অংশ হিসেবে ১১ দলের লংমার্চের আগের দিন শুক্রবার শাহবাগে গণবিক্ষোভ সমাবেশ করে দলটি। সমাবেশের আগে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এনসিপির নেতারা সপ্তাহব্যাপী প্রচারপত্র বিতরণ করেন। এসব কর্মসূচিতে লংমার্চের বিষয়ে এনসিপি নেতাদের কিছুই বলতে শোনা যায়নি।

গতকালের খুলনা অভিমুখে লংমার্চে হাসনাত আবদু্ল্লাহসহ এনসিপির চার কেন্দ্রীয় নেতা অংশ নেন। তবে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন লংমার্চে যাননি।

যদিও গত সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগ অভিমুখে আগের দুটি লংমার্চে অংশ নিয়েছিলের এনসিপির আহ্বায়ক, সদস্যসচিবসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রায় সবাই।

খুলনা বিভাগীয় লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের যোগ না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী \Iপ্রথম আলোকে \Iবলেন, ‘এনসিপি জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোয় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রতিটি দল আলাদাভাবে করবে, আমরা সেই জায়গাটাতেও ফোকাস করছি।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ