শাহজাদপুর সংবাদ

এবার শীত কি কম হবে, কেন এমনটা বলা হচ্ছে

৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:১৪ PM

এবার শীত কি কম হবে, কেন এমনটা বলা হচ্ছে

এপ্রিল–মে মাসে যে গরম গেছে, সে সময় হাতে গোনা কয়েক দিন বাসায় এসি চালিয়েছিলেন ফরহাদ হোসেন। রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে থাকেন তিনি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

ফরহাদ বলছিলেন, ‘এবার গ্রীষ্ম কিছুটা সহনীয় ছিল। বৃষ্টি–বাদলও হয়েছে। কিন্তু শরৎকাল হলেও সেপ্টেম্বরে গরম ছিল অনেক বেশি। মনে হয়েছে, মাসের অর্ধেকের বেশি দিন এসি চালাতে হয়েছে। অক্টোবরেও সেই গরম রয়ে গেছে।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টি কম হয়েছে যথাক্রমে ৮ ও ১৮ শতাংশ। এ দুই মাসে তাপমাত্রাও ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। অক্টোবরেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

অক্টোবরের শেষ দিকে দেশের উত্তর জনপদ ও পার্বত্য এলাকার ভোরে কুয়াশার দেখা মিলতে পারে। দিনভর গরম, ভোরে কিছুটা শীতল বাতাস, কোথাও আবার কুয়াশা, এমন আবহাওয়ার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে শীতের দিকে এগোবে দেশ।

প্রশ্ন হলো, এবারের শীত কি আগের মতো কাঁপাবে? নাকি চলমান উষ্ণতার ধারাবাহিকতায় শীত হবে তুলনামূলক কম ও কম স্থায়ী? এই প্রশ্নের পেছনে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের এই প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে হলেও এর প্রভাব বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টি ও তাপমাত্রার বিন্যাসের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছাতে পারে।

আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস বলছে, এবার শীত একেবারেই থাকবে না, এমন নয়। তবে শীতের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। তীব্র শৈত্যপ্রবাহের স্থায়িত্ব কম হতে পারে। একই সঙ্গে বৃষ্টি কম হলে ঘন কুয়াশা বাড়তে পারে। ফলে দিনের বেলা কুয়াশায় ঠান্ডা অনুভূত হলেও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।

উষ্ণ শরতের পর শীতের প্রশ্ন

বাংলাদেশে সাধারণত অক্টোবরের শেষ দিক থেকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। নভেম্বরের শেষ দিকে উত্তরের হিমেল বাতাসের প্রভাব বাড়ে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকে শীতের মূল সময়।

কিন্তু এবার শরৎকালেও গরমের অনুভূতি কমেনি। দিনের তাপমাত্রা বেশি থাকার পাশাপাশি বৃষ্টির ঘাটতিও দেখা গেছে। ফলে বাতাসে আর্দ্রতা, ধুলো ও দূষণের প্রভাব অনেক জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ বলেন, জুনের পর থেকেই এল নিনোর শক্তিশালী অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো ভারতীয় অঞ্চলে পড়ে।

বজলুর রশীদ বলেন, ‘শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্মে অনিয়মিত বৃষ্টি ও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে। শীতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে।’

বজলুর রশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অক্টোবর ও অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর, দুই সময়ের পূর্বাভাসেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। একই সময়ে বৃষ্টিও কম হতে পারে।

এল নিনো কীভাবে আবহাওয়া বদলায়

এল নিনো কোনো ঝড়, বায়ুপ্রবাহ বা নির্দিষ্ট দিনের আবহাওয়ার ঘটনা নয়। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং সেখানকার বায়ুমণ্ডলীয় চাপের বড় ধরনের পরিবর্তন।

স্বাভাবিক সময়ে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে নিয়মিত বাতাস বয়ে যায়। এই বাতাস সমুদ্রের ওপরের উষ্ণ পানি ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে রাখে। দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছে তখন গভীর সমুদ্রের তুলনামূলক ঠান্ডা পানি ওপরে উঠে আসে।

এল নিনোর সময় ওই নিয়মিত বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে জমে থাকা উষ্ণ পানি মধ্য ও পূর্ব অংশে ছড়িয়ে যায়। বৃষ্টি ও বজ্রমেঘের প্রধান অঞ্চলও তখন পূর্ব দিকে সরে যায়।

এই পরিবর্তনের প্রভাব প্রশান্ত মহাসাগরে সীমাবদ্ধ থাকে না। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ুচাপ, বাতাস, বৃষ্টি ও তাপমাত্রার ধরন বদলে যায়। এল নিনো এবং এর বিপরীত শীতল পর্যায় লা নিনাকে একসঙ্গে বলা হয় এল নিনো–সাউদার্ন অসিলেশন বা এনসো।

তবে এল নিনো শক্তিশালী হলেই প্রতিটি অঞ্চলে একই ধরনের আবহাওয়া হবে, এমন নয়। কোনো জায়গায় বৃষ্টি কমতে পারে, কোথাও আবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও তাপপ্রবাহ বাড়তে পারে, কোথাও ঠান্ডা বা ঝড়ের ধরন বদলে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসে কী বলা হচ্ছে

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমওর ৩ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ এল নিনো আপডেটে বলা হয়েছে, এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সামনের মাসগুলোতে আরও শক্তিশালী হতে পারে। সেপ্টেম্বর–নভেম্বর ২০২৬ এবং ডিসেম্বর ২০২৬–ফেব্রুয়ারি ২০২৭—দুই সময়েই এল নিনো অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। বছরের শেষ দিকে এটি খুব শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

ডব্লিউএমওর সেপ্টেম্বর–নভেম্বর ২০২৬ মৌসুমি পূর্বাভাসে প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নিনো ৩ দশমিক ৪ অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বিবিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিভিন্ন আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাসের কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, এবারের এল নিনো কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি হতে পারে। এর প্রভাবে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ডও তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

তবে এসব বৈশ্বিক পূর্বাভাস থেকে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট জেলা বা মাসের আবহাওয়া সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না। বাংলাদেশের আবহাওয়ার ওপর বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ, মৌসুমি বায়ু, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, মেঘের চলাচল ও স্থানীয় বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিরও বড় প্রভাব রয়েছে।

শীত কি কমবে

এল নিনোর প্রভাবে এবার শীতের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে এর অর্থ এই নয় যে শীত থাকবে না বা কোনো শৈত্যপ্রবাহ হবে না।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, ‘শীতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকবে। তবে বৃষ্টি কম হলে কুয়াশা বাড়তে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে দিনের তাপমাত্রা কমে ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। কিন্তু রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।’

এই দুই ধরনের পরিস্থিতি একই শীতে দেখা দিতে পারে। রাতে আকাশ পরিষ্কার থাকলে বিকিরণের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের তাপ দ্রুত কমে যায়। কিন্তু বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে এবং কুয়াশা তৈরি হলে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ঠান্ডা বাতাস আটকে থাকে। এতে দিনের বেলা সূর্যের আলো কম পৌঁছায় ও তাপমাত্রা কমতে পারে।

বৃষ্টি কম হলে বাতাসের ধুলো ও দূষণও সহজে ধুয়ে যায় না। এসব কণা জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে কুয়াশা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে বৃষ্টির ঘাটতি শীতকে পুরোপুরি উষ্ণ করে দেবে, এমন সরল হিসাব করা যায় না। বরং শীতের ধরন বদলে যেতে পারে।

সমুদ্রের উষ্ণতা থেকে স্থলভাগে প্রভাব

আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর প্রভাবের কারণে সামগ্রিক আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘এল নিনোর সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ ও সমুদ্রের ওপরের স্তরে অতিরিক্ত তাপ জমা হয়। সেই তাপের প্রভাব ওপরের বায়ুমণ্ডলেও পড়ে। পরে বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে এর প্রভাব দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে যায়।’

মল্লিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সরাসরি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা সীমিত হলেও বিভিন্ন গাণিতিক মডেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও সমুদ্রের ওপরের স্তরে তাপ সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

মল্লিক বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরের ওপরের নিম্ন বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে তার প্রভাব উপকূলীয় দেশগুলোতে পড়ে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।’

অক্টোবর ও নভেম্বরে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সাধারণত ২৬ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেশি থাকলে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও বাড়তে পারে। তবে এই জলীয় বাষ্প কোথায় বৃষ্টি তৈরি করবে, আর কোথায় কুয়াশা বা মেঘ তৈরি করবে, তা নির্ভর করে বাতাসের গতিপথ ও বায়ুচাপের ওপর।

উচ্চচাপ বলয়ের প্রভাব

মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, স্বাভাবিক নিয়মে ২৩ সেপ্টেম্বরের পর দিন ছোট ও রাত বড় হতে শুরু করে। একই সময়ে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে হিমালয়ের শীতল বাতাস বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এতে ধীরে ধীরে শীত নামার কথা।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ ও নিম্ন বায়ুমণ্ডল উষ্ণ থাকার পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার ওপরে একটি বিস্তৃত উচ্চচাপ বলয় তৈরি হচ্ছে। এই বলয় আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

মল্লিক বলেন, ‘এই উচ্চচাপ বলয়ের কারণে দিনের বেলার উত্তাপ ও জলীয় বাষ্প ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারবে না। সেগুলো নিচের দিকেই আটকে থাকবে। ফলে রাতে বিকিরণজনিত স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাবে।’

এর প্রভাবে সামগ্রিক আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ থাকতে পারে। শীতকালীন নিম্নচাপ তৈরির প্রবণতাও কমে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

মল্লিকের বিশ্লেষণে, বাংলাদেশে শীতকালে তাপমাত্রা সাধারণত স্থানভেদে ১২ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। উত্তরাঞ্চলে তা ১২ থেকে ১৬ ডিগ্রিতে নেমে আসতে পারে। এবার গড় তাপমাত্রা প্রায় ১৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে।

মল্লিক বলেন, ‘এবার তীব্র শৈত্যপ্রবাহের স্থায়িত্ব কম হতে পারে। সহজ কথায়, এল নিনোর প্রভাবে আমরা তুলনামূলক উষ্ণ এবং কম ব্যাপ্তির একটি শীতকাল পার করতে যাচ্ছি।’

এল নিনো মানেই কি বাংলাদেশে বৃষ্টি কমবে

দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনোর সঙ্গে সাধারণত দুর্বল বা অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টির সম্পর্ক দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে বৃষ্টির ধরন শুধু এল নিনোর ওপর নির্ভর করে না।

বাংলাদেশের বৃষ্টিতে বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ, মৌসুমি বায়ুর অক্ষরেখা, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, ম্যাডেন–জুলিয়ান অসিলেশন এবং স্থানীয় বায়ুমণ্ডলের ভূমিকা রয়েছে। তাই কোনো মৌসুমে মোট বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিক থাকলেও বৃষ্টি অল্প সময়ে বেশি হয়ে যেতে পারে। আবার দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হয়ে পরে কয়েক দিনে ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

বজলুর রশীদ বলেন, ‘এল নিনোর সময় বৃষ্টি অনেক সময় অনিয়মিত হয়। এক দফায় খুব বেশি বৃষ্টি হতে পারে, আবার দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না–ও হতে পারে। জুলাইয়ে আমরা এমন অনিয়মিত বৃষ্টির প্রবণতা দেখেছি।’

শীতের সময় বৃষ্টি কম হলে বায়ুতে ধুলো ও দূষণ বাড়তে পারে। এতে কুয়াশা ঘন হওয়ার পাশাপাশি ঢাকার মতো বড় শহরে বায়ুর মান আরও খারাপ হতে পারে। উত্তরাঞ্চলে কুয়াশার কারণে সড়ক ও নৌপথে চলাচলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।

শীত কমলে কী প্রভাব পড়বে

শীত কম স্থায়ী হলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়বে। শীতবস্ত্রের চাহিদা কমতে পারে, আবার কুয়াশা ঘন হলে যানবাহন চলাচল ও ভোরের কাজকর্মে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

কৃষিতেও এর প্রভাব থাকতে পারে। শীতকালীন অনেক ফসলের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার ঠান্ডা প্রয়োজন হয়। আবার অতিরিক্ত কুয়াশা থাকলে গাছের পাতায় দীর্ঘ সময় আর্দ্রতা জমে থাকতে পারে। এতে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে কোন ফসলের ওপর কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে অঞ্চল, মাটির আর্দ্রতা, বৃষ্টির পরিমাণ এবং কুয়াশার স্থায়িত্বের ওপর।

শীতের সময় বৃষ্টি কম হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। শীত শেষে বোরো মৌসুমে সেচের প্রয়োজনও বাড়বে। ফলে পানি ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে পারে।

অন্যদিকে শীত কম থাকলেও ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে পরের গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহ দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আবহাওয়াবিদেরা মনে করছেন।

বজলুর রশীদ বলেন, ‘এল নিনো ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শক্তিশালী থাকতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে দুর্বল হলেও পরের গ্রীষ্মের আবহাওয়ায় এর প্রভাব থাকতে পারে। তাপপ্রবাহ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি তখন বাড়তে পারে।’

তীব্র শৈত্যপ্রবাহ কি একেবারেই হবে না

এল নিনো সক্রিয় থাকা মানেই বাংলাদেশে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হবে না, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। কোনো অঞ্চলে ঠান্ডা বাতাসের প্রবেশ, আকাশের অবস্থা, কুয়াশা ও বাতাসের গতিপথ বদলে গেলে কয়েক দিন বা একাধিক দফায় শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে।

আবহাওয়াবিদদের বিশ্লেষণ হলো, পুরো শীত মৌসুমের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে ও শৈত্যপ্রবাহের স্থায়িত্ব কম হতে পারে। অর্থাৎ কয়েক দিনের ঠান্ডা থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে কনকনে শীত থাকার সম্ভাবনা কম।

দিনের বেলা কুয়াশা না কাটলে তাপমাত্রা কম মনে হতে পারে। আবার দুপুরের পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলে দ্রুত গরমও অনুভূত হতে পারে। শীতের তাপমাত্রা তাই দিনের সময়, রাতের সময় ও কুয়াশার অবস্থার সঙ্গে বদলে যেতে পারে।

শীতের চেহারা কেমন হতে পারে

সব তথ্য একসঙ্গে দেখলে এবারের শীত সম্পর্কে একটি সম্ভাব্য চিত্র পাওয়া যায়। শীত আসবে, তবে দেরিতে বা ধীরে আসতে পারে। গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। তীব্র শৈত্যপ্রবাহের স্থায়িত্ব কম হতে পারে। বৃষ্টি কম হলে ঘন কুয়াশা বাড়তে পারে। সেই কুয়াশায় দিনের বেলা ঠান্ডা অনুভূত হলেও রাতের তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।

এল নিনোর প্রভাবের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হওয়ায় শীতের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য বদলে যেতে পারে। তবে স্থানীয় আবহাওয়ার অন্য নিয়ামকগুলো ভিন্ন ফলও দিতে পারে।

আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এবার একটানা দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহের পরিবর্তে স্বল্পস্থায়ী ও বিচ্ছিন্ন শৈত্যপ্রবাহ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শৈত্যপ্রবাহের দিনসংখ্যা কম হলেও কোনো কোনো সময়ে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে রাতে পরিষ্কার আকাশ, হালকা বাতাস ও ঘন কুয়াশার পরিস্থিতিতে রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তীব্র শীতের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

তাই ‘এবার শীত হবে না’ বলা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি ‘শীত আগের মতোই থাকবে’ বলাও ঠিক হবে না। আবহাওয়াবিদদের বর্তমান বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের শীত তুলনামূলক উষ্ণ, কম স্থায়ী ও কুয়াশাপ্রবণ হতে পারে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ