শাহজাদপুর সংবাদ

এআই বানালো প্রথম কৃত্রিম ভাইরাস

১২ আগস্ট, ২০২৬ এ ৩:৩০ PM

এআই বানালো প্রথম কৃত্রিম ভাইরাস

নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রথমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অনেকগুলো ডিএনএর তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন কোনো ভাইরাসের ডিএনএ বানানোর নির্দেশ দেন। এআইয়ের দেওয়া নকশা থেকে পাওয়া জিনোমগুলোর মধ্যে ১৬টি কাজ করার মতো উপযুক্ত ছিল। বিজ্ঞানীরা সেগুলোর সাহায্যে একদম নতুন ধরনের কৃত্রিম ভাইরাস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে একদম নতুন ধরনের ভাইরাস তৈরি করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে একটি নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাও তৈরি করছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে হয়তো কোনো বিপজ্জনক জীবাণুও বানিয়ে ফেলা হতে পারে!

একেবারে নতুন করে ভাইরাস তৈরি করা অবশ্য বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। গবেষণার জন্য তাঁরা অনেক আগেই ভাইরাসের জিনোম বা ডিএনএ তৈরি করার কৌশল আবিষ্কার করেছেন। এসব কৃত্রিম ভাইরাস মূলত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ও টিকা তৈরির কাজে এবং ভাইরাসের কার্যপ্রণালি বুঝতে ব্যবহার করা হয়।

তবে সম্প্রতি সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গবেষকেরা সাধারণ উপায়ে ভাইরাস তৈরি করার বিষয়টিতেই থেমে থাকেননি; তাঁরা আরও অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়ার আর্ক ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা এআইকে প্রাকৃতিক ডিএনএর গঠন চিনতে শিখিয়েছেন। এরপর সেই ডেটা বা উপাত্ত ব্যবহার করে এআই সম্পূর্ণ নতুন ভাইরাস তৈরির নিজস্ব নকশা তৈরি করতে পেরেছে।

গবেষকেরা এআইয়ের দেওয়া পদ্ধতি ও নির্দেশনা মেনে ডিএনএ অণু তৈরি করেন। এরপর সেই ডিএনএগুলো ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। সেখান থেকে পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়াগুলো এমন কিছু ভাইরাস তৈরি করে, যা প্রকৃতিতে আগে কখনো ছিল না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই কৃত্রিম ভাইরাসগুলো অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে পারছিল। এটিই প্রমাণ করে যে কৃত্রিম ভাইরাসগুলো সত্যি সত্যিই টিকে থাকতে সক্ষম।

ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনথেটিক বায়োলজিস্ট প্যাট্রিক কাই বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে এটি অনেক বড় একটি সফলতা।’

তবে ভয়ের কিছু নেই। এআইয়ের তৈরি করা এই নতুন ভাইরাসগুলো মানুষের শরীরের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। কারণ, এগুলো ‘ফাই এক্স-১৭৪’ নামে একটি প্রাকৃতিক ভাইরাসের ওপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছে। এটি এমন একধরনের ভাইরাস, যা কেবল ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের ব্যাকটেরিওফাজ বলা হয়। ফাই এক্স-১৭৪ ভাইরাসটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে বেশ বিখ্যাত। ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানী ফ্রেডরিখ স্যাঙ্গার প্রথমবারের মতো এই ভাইরাসেরই ডিএনএ জিনোম সিকোয়েন্স করেছিলেন। এটিই ছিল মানব-ইতিহাসে সম্পূর্ণ সিকোয়েন্স করা প্রথম কোনো ডিএনএ জিনোম।

তা সত্ত্বেও এই গবেষণা নতুন এক দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়তো খুব বিষাক্ত জীবাণু কিংবা ছোঁয়াচে মহামারি ছড়িয়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক জৈব অস্ত্র বানানো হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির গবেষক মরিটজ হ্যাঙ্ক জানান, বিজ্ঞান যেভাবে দ্রুত এগিয়ে চলেছে, সেই তুলনায় বিপজ্জনক ভাইরাস বানানো ঠেকানোর সরকারি ও বৈজ্ঞানিক নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলো এখনো বেশ পিছিয়ে আছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও নিরাপত্তার প্রস্তুতির মধ্যে বিশাল একটি ফাঁক রয়ে গেছে।

এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ‘ইভো’ নামে একটি এআই মডেল ব্যবহার করেছেন। প্রযুক্তিগত কিছু দিক থেকে এটি ওপেনএআইয়ের তৈরি চ্যাটজিপিটির মতোই কাজ করে। চ্যাটজিপিটি মূলত বড় একটি লেখা তৈরি করার সময় একটি শব্দের পর কোন শব্দটি আসা উচিত, সেই হিসাব-নিকাশ করে উত্তর সাজায়। ইন্টারনেট, বই ও নানা লেখার বিশাল ভান্ডার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েই সে এই কাজটি করতে শেখে।

ডিএনএ কিন্তু একটি বইয়ের মতোই। এটি মূলত নিউক্লিওটাইড নামে কিছু অণু দিয়ে তৈরি লম্বা শিকলের মতো, যা কোনো লেখার অক্ষরের মতো পরপর সাজানো থাকে। যেকোনো জিনে A, C, G এবং T (অ্যাডেনিন, সাইটোসিন, গুয়ানিন ও থাইমিন)—এই চারটি রাসায়নিক সংকেত শত শতবার সাজানো থাকে। এই সাজানো ক্রমগুলো থেকেই শরীর বুঝতে পারে, তাকে কীভাবে প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদান তৈরি করতে হবে।

ভাষার মতো ডিএনএরও নিজস্ব কিছু নিয়ম রয়েছে। যদি এই সংকেতের ক্রমে ভুল হয়, তবে শরীর তা থেকে কোনো অর্থ বুঝতে পারে না। জীববিজ্ঞানীরা প্রকৃতির এই নিয়মের কিছু অংশ আবিষ্কার করলেও বড় একটি অংশ এখনো আমাদের অজানা।

গবেষকেরা দেখতে চেয়েছিলেন, ইভো নামে এআই মডেলটি এই নিয়মগুলো নিজে নিজে বুঝে নিতে পারে কি না। তাই তারা সাধারণ লেখার বদলে হাজার হাজার প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব ও ভাইরাসের বিশাল জিনগত তথ্য দিয়ে ইভোকে প্রশিক্ষণ দেন। সব মিলিয়ে ইভো প্রায় ৯ লাখ কোটি (৯ ট্রিলিয়ন) নিউক্লিওটাইডের তথ্য বিশ্লেষণ করে।

প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর ইভো জীবজগতের নানা জিনের ভেতর লুকিয়ে থাকা নিয়ম ধরে ফেলে। এরপর সে এই নিয়মগুলো কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট কাজ করতে শুরু করে। পাশাপাশি নতুন জিনের নকশাও তৈরি করতে শেখে। এই সাফল্য দেখে গবেষকেরা ভাবেন, ইভো কি পুরো একটি ভাইরাসের সম্পূর্ণ জিনোম তৈরি করতে পারবে?

জটিল জিনোমের তুলনায় গঠন সহজ হওয়ায় এআই দিয়ে নতুন ভাইরাস তৈরির গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ব্যাকটেরিয়া আক্রমণকারী ‘ফাই এক্স-১৭৪’ ভাইরাসকে বেছে নেন। এটি মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। বিজ্ঞানীরা ইভো মডেলকে এই ফাজ ভাইরাস ও এর সঙ্গীদের গঠন শেখানোর পর, সেটি প্রায় ৭ লাখ নতুন ভাইরাসের নকশা তৈরি করে।

গবেষকেরা সেখান থেকে সম্ভাবনাময় ২৮৫টি নকশা নিয়ে গবেষণাগারে কৃত্রিম ডিএনএ তৈরি করে তা ব্যাকটেরিয়ার ভেতর প্রবেশ করান। পরীক্ষায় দেখা যায়, ইভোর তৈরি ১৬টি জিনোম থেকে সফলভাবে সম্পূর্ণ নতুন কৃত্রিম ভাইরাস তৈরি হয়েছে, যা বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম। এমনকি কিছু কৃত্রিম ভাইরাস প্রাকৃতিক ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত বংশবৃদ্ধি করছিল!

ভবিষ্যতে এআই সৃষ্ট এসব ভাইরাস জিন থেরাপিসহ নানা চিকিৎসায় কাজে আসতে পারে। তবে এটি থেকে বিপজ্জনক জৈব অস্ত্র তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। তাই ঝুঁকি এড়াতে বিজ্ঞানীরা ইভোকে কেবল মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়, এমন সব ব্যাকটেরিওফাজের তথ্য দিয়েই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাতে এটি মানবজাতির কোনো ক্ষতির কারণ হতে না পারে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

এআই বানালো প্রথম কৃত্রিম ভাইরাস | শাহজাদপুর সংবাদ