আয়কর রিটার্নে তথ্য গোপন করলে কী শাস্তি হতে পারে
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৩০ AM

২০২৬–২৭ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় শুরু হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও লাখ লাখ করদাতা তাঁদের আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য দিয়ে রিটার্ন দাখিল করবেন। কেউ নিজে রিটার্ন প্রস্তুত করবেন, আবার কেউ কর পরামর্শক, কর আইনজীবী বা হিসাববিদের সহায়তা নেবেন।
অনেকের কাছে রিটার্ন দাখিল নিছক প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা হলেও আইনগতভাবে আয়কর রিটার্ন কোনো সাধারণ কাগজপত্র নয়; এটি একজন নাগরিকের আর্থিক অবস্থার বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। তাই রিটার্নে তথ্য দেওয়ার সময় সচেতন ও সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।
রিটার্নে কী তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তা শুধু করের পরিমাণ নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে তথ্যের সত্যতা এবং করদাতার আইনগত দায়ও জড়িত। কোনো তথ্য বা সংখ্যা পরিবর্তনের আগে ভাবা প্রয়োজন—এটি কি অনিচ্ছাকৃত ভুলের সংশোধন, নাকি প্রকৃত তথ্য গোপনের সচেতন চেষ্টা?
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা দরকার। অনিচ্ছাকৃত ভুল ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য, এক বিষয় নয়। মানুষের ভুল হতে পারে। হিসাব করতে গিয়ে ভুল হতে পারে, কোনো নথি হাতে না থাকায় ভুল তথ্য চলে আসতে পারে, ব্যাংক হিসাবের তথ্য ভুলভাবে স্থানান্তরিত হতে পারে, সম্পদের মূল্য নির্ধারণে অসাবধানতা হতে পারে। এমন অনিচ্ছাকৃত ভুলকে পরিকল্পিত কর ফাঁকির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩১২-তেই মূল পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে করদায় এড়ানোর চেষ্টা করেন, তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। আয়কর আইনে যার শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে কারাদণ্ডের মেয়াদ ছয় মাসের কম নয়। এর সঙ্গে জরিমানা বা কারাদণ্ড ও জরিমানা উভয়ই হতে পারে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। প্রতিটি ভুল রিটার্নের জন্য পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হবে, এমন কথা আইন বলে না। ভুল তথ্য দিলেই জেল হবে আইন কখনো এমন কথা কিংবা নির্দেশনা দেয় না। তবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের সঙ্গে জেনে-বুঝে কর ফাঁকির জন্য তথ্য গোপন করা এক নয়।
তা ছাড়া একই ধারার উপধারা (২)-এ কয়েকটি কর্মকাণ্ডকে সরাসরি করদায় এড়ানোর ইচ্ছাকৃত চেষ্টা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আয়ের বিশেষ বিবরণ গোপন করা; করদায় কমানোর উদ্দেশ্যে সম্পত্তি, দায় ও ব্যয় সম্পর্কে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রদান করা; সংশ্লিষ্ট হিসাব বা নথিতে অসত্য তথ্য বা বিবৃতি প্রদান করা; মিথ্যা হিসাব বা বিবৃতি প্রস্তুত করা বা করানো; হিসাব বা বিবৃতি থেকে কোনো প্রাসঙ্গিক তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া বা দেওয়ানো এবং প্রদেয় আয়কর পরিশোধ না করার লক্ষ্যে অন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা।
অনেক করদাতা মনে করেন, আয়কর রিটার্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আয় ও করের হিসাব। সম্পদ ও দায়ের বিবরণকে কেউ কেউ তুলনামূলকভাবে গৌণ মনে করেন। এ ধারণা থেকে অনেক সময় বাড়ি, জমি, গাড়ি, ব্যাংক আমানত, বিনিয়োগ কিংবা অন্যান্য সম্পদের তথ্য কম দেখানো বা বাদ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু আইন এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্পষ্ট। ধারা ৩১২-এ করদায় কমানোর জন্য সম্পদ, দায় ও ব্যয় সম্পর্কে ইচ্ছাকৃতভাবে অসত্য তথ্য দেওয়াকেও কর এড়ানোর চেষ্টার আওতায় রাখা হয়েছে।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তির প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি টাকা, কিন্তু তিনি রিটার্নে তা ১ কোটি টাকা দেখালেন। অথবা তাঁর প্রকৃত ব্যাংক আমানত, বিনিয়োগ কিংবা অন্য কোনো সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেটি গোপন করলেন। বিষয়টি যদি করদায় কমানোর উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়, তাহলে তা গুরুতর আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একইভাবে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় দেখিয়ে আয় কমিয়ে ফেলা কিংবা দায়ের পরিমাণ বাড়িয়ে সম্পদের প্রকৃত অবস্থাকে আড়াল করাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘জিরো রিটার্ন’ নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। ধারণাটি এমন যে প্রকৃত আয়, সম্পদ, ব্যয় ও দায় যা-ই থাকুক, রিটার্নের বিভিন্ন ঘরে শূন্য বসিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) এ ধরনের প্রবণতা সম্পর্কে করদাতাদের সতর্ক করেছে। এনবিআর জানিয়েছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এ ‘জিরো রিটার্ন’ নামে কোনো আলাদা রিটার্নের বিধান নেই। করদাতাকে তাঁর প্রকৃত আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য সঠিকভাবে ঘোষণা করতে হবে। প্রকৃত আয় করযোগ্য সীমার নিচে হলে কর দিতে না-ও হতে পারে। কিন্তু এ কারণে প্রকৃত তথ্যের জায়গায় মিথ্যা ‘শূন্য’ বসানোর সুযোগ নেই। এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য বোঝা জরুরি। কারও প্রকৃত আয় যদি আইন অনুযায়ী করযোগ্য না হয়, তাহলে তিনি আইনসম্মতভাবে করমুক্ত থাকতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত আয় বা সম্পদ থাকার পরও সবকিছু শূন্য দেখানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
একজন করদাতা আইনসম্মতভাবে তাঁর করদায় কমাতে পারেন। কর আইনে অনুমোদিত কর অব্যাহতি, বিনিয়োগজনিত সুবিধা, গ্রহণযোগ্য ব্যয়, কর রেয়াত বা অন্যান্য বৈধ সুবিধা গ্রহণ করা কর ফাঁকি নয়, বরং এগুলো কর আইনেরই অংশ।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আইনসম্মত সুবিধার সীমা অতিক্রম করে মিথ্যা তথ্য, গোপনীয়তা বা কৃত্রিম হিসাবের আশ্রয় নেওয়া হয়।
আয়কর কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য চেয়ে নোটিশ প্রদান করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র সংগ্রহ করে যথাযথ আইনি ব্যাখ্যাসহ তা প্রদান করা জরুরি। প্রয়োজনীয় তথ্য বা কাগজপত্র সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হলে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই কারণ উল্লেখ করে আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে সময় বৃদ্ধির আবেদন করা উচিত।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩১১ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য না দিলে, তথ্য দিতে অস্বীকার করলে, পরিদর্শনে বাধা দিলে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা তথ্য দিতে না চাইলে, আয়কর কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে, তাদের দেওয়া আদেশ না মানলে বা আইন অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে ব্যর্থ হলে, তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এসব ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১ (এক) বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
শুধু কর ফাঁকির উদ্দেশ্য প্রমাণিত হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ নয়; আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩১৩ অনুযায়ী জেনে-বুঝে মিথ্যা হিসাব বা বিবৃতি দেওয়ার জন্যও পৃথক শাস্তির বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি এমন হিসাব বা বিবৃতি দিলে, যা তিনি জানেন বা মিথ্যা বলে বিশ্বাস করেন, অথবা সত্য বলে বিশ্বাস করেন না, তাহলে অর্থদণ্ডসহ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং ন্যূনতম ছয় মাস পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।
তবে অনিচ্ছাকৃত ভুল, তথ্যের ব্যাখ্যায় ত্রুটি বা হিসাব করতে গিয়ে ভুল করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এক বিষয় নয়। আইনে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ এবং ‘জানেন বা বিশ্বাস করেন যে মিথ্যা’—এ ধরনের শর্ত থাকায় ভুলের ধরন ও উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ধারা ৩১৪ অনুযায়ী জেনেশুনে মিথ্যা সনদপত্রে স্বাক্ষর বা তা জারি করলেও অপরাধ হতে পারে, যার শাস্তি সর্বনিম্ন ৩ মাস থেকে সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
রিটার্ন দাখিলের সময় ভুল হওয়ার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রিটার্ন জমা দেওয়ার পর ভুল ধরা পড়লে সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত হলো জেনেও বিষয়টি গোপন রাখা। বিশেষ করে ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ, সম্পত্তির মূল্য, উৎসে কর কর্তন, ব্যয় কিংবা আগের বছরের তথ্যের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে। তাই রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র মিলিয়ে দেখা জরুরি। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বেতন বিবরণী, বিনিয়োগের কাগজপত্র, সম্পত্তির দলিল, ঋণের হিসাব, উৎসে করের সনদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথির সঙ্গে রিটার্নের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া উচিত। রিটার্ন দাখিলের পর ভুল ধরা পড়লে সেটি সংশোধনের পথও রয়েছে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৮০(২) অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিলের পর করদাতা যদি বুঝতে পারেন যে আয় দেখানো, কর অব্যাহতি বা ক্রেডিট কিংবা রেয়াত দাবি বা অন্য কোনো কারণে কর সঠিকভাবে হিসাব হয়নি বা সঠিক পরিমাণ পরিশোধ করা হয়নি, তাহলে কারণ উল্লেখ করে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রয়েছে।
তবে এ সুযোগ সীমাহীন নয়। ধারা ১৮০(৩) অনুযায়ী, সংশোধিত রিটার্ন প্রথমবারের পর আবার সংশোধিত রিটার্ন দেওয়া যায় না; মূল রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পরও এই সুযোগ থাকে না। একই সঙ্গে মূল রিটার্ন দাখিলের ১৮০ দিন পার হয়ে গেলে এই ধারার অধীনে সংশোধিত রিটার্ন দেওয়া যায় না। অতএব, ভুল হলে দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়ায় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
অনেক করদাতা নিজেরা রিটার্ন প্রস্তুত না করে পেশাদার কর পরামর্শকের সহায়তা নেন। এতে সুবিধা আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিটার্নে দেওয়া তথ্যের দায় পুরোপুরি অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। করদাতার নিজেরও উচিত রিটার্নে কী তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তা বুঝে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। অন্যদিকে পেশাদারদেরও করদাতার করদায় কমানোর নামে মিথ্যা তথ্য, কৃত্রিম ব্যয় বা গোপন সম্পদ দেখানোর পরামর্শ দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। কারণ, এতে করদাতা যেমন ঝুঁকিতে পড়েন, তেমনি করব্যবস্থার প্রতি পেশাগত আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
করদাতাকে সঠিক তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানানো সহজ। কিন্তু একটি ন্যায্য করব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাষ্ট্রেরও কিছু মৌলিক দায়িত্ব আছে। কর আইনকে সহজবোধ্য করতে হবে। করদাতাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কোন তথ্য কীভাবে দিতে হবে। ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়া সহজ ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। কর প্রশাসনের আচরণে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
পানামা খাল পার হতে মাশুল এখন ৫০ লাখ ডলার, খরচ বাড়ল কেন
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৫:৩১ PM · প্রথম আলো
দুপুর থেকে ৬ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না রাজধানীর যেসব এলাকায়
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৫৭ AM · বাংলা ট্রিবিউন
সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে ৩ বেসরকারি ব্যাংক সরে যাচ্ছে কেন
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:০০ AM · প্রথম আলো
