শাহজাদপুর সংবাদ

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে কোনো দিন খেলেননি, কিন্তু বিশ্বকাপ জিতেছেন এই গোলরক্ষক

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:২৭ PM

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে কোনো দিন খেলেননি, কিন্তু বিশ্বকাপ জিতেছেন এই গোলরক্ষক

২২ জুন ১৯৮৬। মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড।

সেই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় ২টি গোলের কারণে। একটা ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’। সেটার মিনিট চারেক পর তাঁর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। একই ম্যাচ, একই মানুষ এবং তাঁর বিতর্কিত সেই গোলের পর অমরত্ব পাওয়া গোলটি! সেদিনের সেই ম্যাচটা তাই স্রেফ ম্যারাডোনার।

কিন্তু সেই গল্পে আরও একজন লুকিয়ে ছিলেন, পর্দার আড়ালে।

ম্যারাডোনার গায়ে সেদিন ছিল না আর্জেন্টিনার চেনা আকাশি-সাদা ডোরার জার্সি। ছিল নীল জার্সি, যা পরের চার দশকে পরিণত হয়েছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত পোশাকে। কিন্তু সেই জার্সি মাঠ পর্যন্ত পৌঁছানোর নেপথ্যের মানুষটাকে কেউ মনে রাখেনি। অথচ তাঁর গল্পটাই হতে পারত সেই বিশ্বকাপের আশ্চর্য এক অধ্যায়।

নাম তাঁর হেক্টর জেলাদা। ওই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক। না ১ নম্বর নয়, ৩ নম্বর গোলরক্ষক। অথচ সেই বিশ্বকাপে, তার আগে বা পরে কোনো দিনও আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে একটি মিনিটের জন্যও মাঠে নামেননি জেলাদা। বিশ্বকাপ জিতেছেন, পদক উঠেছে গলায়, অথচ জাতীয় দলের হয়ে কোনো দিন অভিষেকই হয়নি তাঁর! ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসেও এমন উদাহরণ বিরল।

গল্পটা শুরু থেকে বলা যাক।

জেলাদার ফুটবলে হাতেখড়ি রোজারিও সেন্ট্রালে। কিন্তু ১৯৭৯ সালে আর্জেন্টিনা ছেড়ে তিনি পাড়ি জমান মেক্সিকোয়, খেলা শুরু করেন ক্লাব আমেরিকার হয়ে। সেখানেই তিনি বনে যান তারকা, হয়ে যান মেক্সিকান ফুটবলের বড় এক নাম। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫—পরপর তিন বছর মেক্সিকোর সেরা গোলরক্ষক নির্বাচিত হন। অথচ নিজের দেশের জাতীয় দলে তখনো তিনি ব্রাত্য।

কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচ কার্লোস বিলার্দো সেই জেলাদাকে একটা প্রীতি ম্যাচেও পরখ না করে বিশ্বকাপ দলে ঠিকই রেখে দিলেন।তৃতীয় গোলরক্ষক হিসেবে। আর্জেন্টাইন ফুটবলমহলে তখন এ সিদ্ধান্ত রীতিমতো বিস্ময় তৈরি করেছিল।

সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ১ নম্বর গোলকিপার হওয়ার কথা ১৯৭৮-এর নায়ক উবালদো ফিলোলের। কিন্তু ১৯৮৩ কোপা আমেরিকার পর বিলার্দো আর রাখলেন না তাঁকে। প্রথম পছন্দ হয়ে উঠলেন তরুণ নেরি পুম্পিদো, বিকল্প হলেন লুইস ইসলাস। আর তৃতীয়, সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জায়গাটায় নাম লেখালেন মেক্সিকোপ্রবাসী জেলাদা।

এই নির্বাচনের পেছনে জড়িয়ে ছিল আরও একটা সুতো। আর্জেন্টিনা দল ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সময় ঘাঁটি গেড়েছিল ক্লাব আমেরিকারই অনুশীলনকেন্দ্রে, যেখানে জেলাদা রীতিমতো পূজনীয় এক নাম। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির সময় ক্লাব আমেরিকার হয়ে প্রীতি ম্যাচেও খেলেছেন তিনি, প্রতিপক্ষ ছিল তাঁর নিজের দেশ আর্জেন্টিনাই।মজার ব্যাপার হচ্ছে, ফিলোলকে নিয়ে জেলাদার মুগ্ধতা ছিল প্রকাশ্য। তিনি বলতেন, ফিলোলই তাঁর আইডল। কোচের অবশ্য এটা মোটেও পছন্দ ছিল না। বিলার্দো তাঁকে একবার সরাসরিই বলে দিয়েছিলেন, ‘আর কখনো বোলো না যে ফিলোল তোমার আদর্শ, এতে আমাকে বোকার মতো দেখায়।’ আরেকবার আরও রাগ করে নাকি বলেছিলেন, ‘সব সাংবাদিক আমার কাছে ফিলোলের কথা জানতে চায়, আমি তোমাকে দলে রাখলাম, আর তুমি কিনা ফিলোলের প্রশংসা করে বেড়াও...এভাবে চললে লোকজন তো আমার বিরুদ্ধে চলে যাবে।’

এবার ফেরা যাক সেই নীল জার্সির গল্পে। মাঠের বাইরে জেলাদার নিজের একটা স্পোর্টসওয়্যার দোকান ছিল। আর সেই সুবাদে আর্জেন্টিনাকে তখন জার্সি জোগান দিত যে ফরাসি প্রতিষ্ঠান, সেই ‘লে কক স্পোর্তিফ’-এর সঙ্গেও তাঁর ভালো যোগাযোগ ছিল । ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে যখন হঠাৎই বিকল্প নীল জার্সির দরকার পড়ল, তখন কাজে লাগল জেলাদার এই যোগাযোগ। তিনিই তড়িঘড়ি করে এই জার্সিটা বানিয়ে আনার কাজ করেছিলেন। ফলে যে জার্সি গায়ে ম্যারাডোনা লিখলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ২ গোলের গল্প, তার নেপথ্যে ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর নিজের কখনো সুযোগই হয়নি সেই জার্সি গায়ে মাঠে নামার।

অথচ ইতিহাস অন্যভাবেও লেখা হতে পারত। বিশ্বকাপের আগে মেক্সিকোও চেয়েছিল জেলাদাকে নিজেদের করে নিতে। ক্লাব আমেরিকার হয়ে টানা কয়েকটা দুর্দান্ত মৌসুম কাটানোর পর তাঁকে নাগরিকত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। জেলাদা নিজেই পরে বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপের আগে গিয়ের্মো কানিয়েদোর (মেক্সিকান ফুটবল ফেডারেশনের শীর্ষ কর্তা) আমন্ত্রণে দুপুরের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার, সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট রাফায়েল দেল কাস্তিয়োও। তাঁরা আমাকে নাগরিকত্ব নিয়ে মেক্সিকো জাতীয় দলের হয়ে খেলার কথা বলেছিলেন।’

শেষ পর্যন্ত সেটা আর হয়নি; কারণ, তত দিনে আর্জেন্টিনার হয়ে একটা আন্তর্জাতিক যুব টুর্নামেন্টে খেলে ফেলেছিলেন জেলাদা। পরে ইএসপিএনকে তিনি বলেছিলেন, ‘মেক্সিকো জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেলে নিজের সবটুকুই উজাড় করে দিতাম, কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল বলেই ডাক পেয়েছিলাম আর্জেন্টিনা থেকে, আর নিজেও অবাক হয়ে গিয়েছিলাম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিয়ে।’

অদ্ভুতই বটে! বিশ্বকাপ জিতলেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে জেলাদার ম্যাচসংখ্যা রয়ে গেছে শূন্যই। কখনো জাতীয় দলের জার্সিতে খেলাই হয়নি তাঁর। বিশ্বকাপের আগেও না, পরেও না। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের তৃতীয় গোলরক্ষক রিকার্দো লা ভোল্পের কথাই ধরা যাক, তিনি অন্তত পরে ছয়টা ম্যাচ খেলেছিলেন জাতীয় দলের জার্সিতে। জেলাদার ভাগ্যে তা-ও জোটেনি।

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল বেশ কিছু কীর্তি আছে। ড্যানিয়েল প্যাসারেল্লা দুবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন, সেটাও যেমন বিরল। কিন্তু মাঠে না নেমে বিশ্বজয়? এটা একেবারেই অন্য রকম।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ